হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:০৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
শুল্ককর কমানোর আগে খেজুরের অন্যতম পাইকারি বাজার চট্টগ্রাম নগরীর ফলমণ্ডিতে ভালো মানের এক কেজি আজওয়া খেজুর বিক্রি হতো ১ হাজার ৪০০ টাকায়। গত মঙ্গলবার খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাজারটিতে ওই একই দামে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি আজওয়া খেজুর। শুধু আজওয়া খেজুর নয়; মেডজুল, মরিয়মসহ বাজারে থাকা অন্যান্য খেজুরের দামও কমেনি। শুল্ককর কমানোর আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে এসব খেজুর।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্ককর কমানোর পর নতুন করে খেজুর আমদানি খুব একটা হয়নি। বাজারে এখন যেসব খেজুর বিক্রি হচ্ছে সেগুলো আগেই আমদানি করা হয়েছিল। তাই সেসবের দামও আগের মতোই রাখা হচ্ছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফলমণ্ডি এলাকার আলী জেনারেল ট্রেডিংয়ের ম্যানেজার রাফি চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনবিআর খেজুর আমদানিতে শুল্ককর কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছে, বাস্তবে এখনও তার প্রতিফলন ঘটেনি। কারণ বাজারে এখন যেসব খেজুর বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো আগে আমদানি করা। খেজুরের দাম কমাতে হলে সরকারকে শুল্ককর আরও কমাতে হবে। ১০০ টাকায় যেখানে ৫০ টাকার বেশি শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। সেখানে ১০ শতাংশ কমালে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।’
আমদানি বাড়েনি, বরং কমে এসেছে
আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২২ সালে খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ককর বাড়িয়ে দিয়েছিল সরকার। খেজুর আমদানিতে তখন ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট), ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর ও ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক মিলিয়ে মোট ৫৯ শতাংশ করভার আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানে থেকে গত ২১ নভেম্বর বিভিন্ন ধরনের খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানায় এনবিআর। সেই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে আরোপিত অগ্রিম কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে এই সুবিধা আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এনবিআর খেজুর আমদানিতে শুল্ককর কমানোর পরও পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম কমেনি। বাজারে এখনও আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের খেজুর। পণ্যটির অন্যতম পাইকারি বাজার ফলমণ্ডিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারে এখন আজওয়া খেজুর প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ টাকায়। মাবরুম প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। মেডজুল প্রতি কেজি ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকায়। মরিয়ম খেজুর প্রতি কেজি ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪৮০ টাকায় এবং আম্বর খেজুর প্রতি কেজি ১ হাজার ৫৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কম দামি খেজুরের দাম কিছুটা কমেছে। পাইকারিতে প্রতি কেজি জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়। আলজেরিয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬৪০ টাকায়।
এদিকে দাম আগের মতো থাকলেও চলতি অর্থবছর খেজুর আমদানি বাড়েনি। দাম বৃদ্ধির কারণে চাহিদা কমে যাওয়ায় উল্টো চলতি অর্থবছর দেশে খেজুর আমদানি কমছে। আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় খেজুর আমদানি কমেছে ২ হাজার ২৮১ মেট্রিক টন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে খেজুর আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন। সেখানে এবার চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গত চার মাসে খেজুর আমদানি হয়েছে ২ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন। এই হিসেবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার খেজুর আমদানি কম হয়েছে ২ হাজার ২৮১ মেট্রিক টন। নভেম্বর মাসেও খেজুর আমদানি বাড়েনি। উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ (চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর) কেন্দ্রের উপপরিচালক মো. শাহ আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গত দেড় মাসে খেজুর আমদানি হয়েছে ৯৭২ মেট্রিক টন।’
রমজানেও খেজুরের সংকট হবে না
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ৫ মাসে খেজুর আমদানি কম হলেও বাজারে পণ্যটির কোনো সংকট তৈরি হয়নি। খেজুর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা কারণে এখন বাজারে খেজুরের চাহিদা কমেছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে নগরীর ফলমণ্ডি এলাকার খেজুর ব্যবসায়ী আবিদ এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুর রহমান বলেন, ‘খেজুর বেচাকেনা এখন খুব একটা হয় না। আগে এমন সময়ে যে পরিমাণ খেজুর বেচাকেনা হতো, তার অর্ধেকও এখন হয় না। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের খরচ বেড়েছে, বেসিক চাহিদা পূরণ করতেই এখন মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।’
বাজারে খেজুরের চাহিদা কম হওয়ায় কম আমদানির পরও বাজারে সংকট নেই। রমজানেও বাজারে খেজুরের সংকট তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ রমজান মাসের জন্য ব্যবসায়ীরা খেজুর আমদানি শুরু করেন রমজানের দুই মাস আগে। সেই হিসেবে আগামী মাস থেকে শুরু হবে রমজান সামনে রেখে খেজুর আমদানি। তবে কিছু কিছু আমদানিকারক ইতোমধ্যে খেজুর আমদানি শুরু করেছেন।
খেজুর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চট্টলা ডেটস-এর মালিক নাজমুল হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রমজানে বাজারে খেজুরের সংকট হবে না। তবে আমরা দাম নিয়ে শঙ্কায় আছি। বাজারে খেজুরের যেই পরিমাণ সরবরাহ আছে, সেই পরিমাণ বেচাকেনা নেই। চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি কম হচ্ছে। রমজান সামনে রেখে ইতোমধ্যে অনেকে এলসি করা শুরু করেছেন। জানুয়ারি মাসের শুরুতেই নতুন এলসির মাল বাজারে ঢুকতে শুরু করবে।’