মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর
শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৩৯ পিএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৪৭ পিএম
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহীর চারঘাটে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নেই। জাদুঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক, চিঠিপত্র বা মুক্তিযুদ্ধকালীন কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকায় স্থানীয়রা হতাশা প্রকাশ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল অস্ত্রে সজ্জিত বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিবর্ষণে উপজেলার দুই শতাধিক বেসামরিক মানুষ শহীদ হয়। আহত হয় আরও কয়েক শতাধিক। শুধু গুলি করে ক্ষান্ত হয়নি, পেট্রোল ঢেলে মৃতদেহের শরীর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলায় নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর।
উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গৌরব ও বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানাতে যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের ৩৬০টি ঐতিহাসিক স্থান চিহ্নিত করা হয়। এসব স্থান মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতিটিতে নির্মাণ করা হয় একটি করে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর। তারই অংশ হিসেবে চারঘাট উপজেলার স্মৃতিবিজড়িত শহীদ শিবলী চত্বরে ২০২০ সালে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর।
থানাপাড়া গ্রামের রায়হান আলী জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে জীবন রক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে কয়েক হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু সীমান্তবর্তী পদ্মা নদীর তীরে আশ্রয়গ্রহণ করে। হানাদার বাহিনী তৎকালীন পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারসংলগ্ন পদ্মার তীরে গিয়ে এসব নারী, পুরুষ ও শিশুর উপস্থিতি দেখে তাদের ঘেরাও করে। অবশেষে নারী ও শিশুদের ছেড়ে দিলেও পুরুষদের আটকে রেখে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। শুধু গুলি করেও ক্ষান্ত হয়নি হানাদার বাহিনী, মৃত্যু নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী জেনোসাইড শুরু করে। নিহত হয় থানাপাড়া, কুঠিপাড়া, গৌরশহরপুর, বাবুপাড়া ও তৎকালীন পুলিশ ট্রেনিংয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ দুই শতাধিক নিরস্ত্র বেসামরিক পুরুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর একটি আকর্ষণীয় স্থাপনা হিসেবে তৈরি হলেও এর ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মারক বা ঐতিহাসিক নিদর্শন নেই। মনে হচ্ছে পরিত্যক্ত একটি ভুতুড়ে স্থাপনা। ফলে এটি শুধু একটি ভবনে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বলে মনে করছে স্থানীয়রা। অনেকেই অভিযোগ করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় জাদুঘরটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এখানে একটি জাদুঘর হলেও মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। এমনকি জাদুঘরটি রক্ষণাবেক্ষণেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা বলেন, ‘জাদুঘর নির্মাণের সময় আশা করেছিলাম এখানে সংগ্রামের নিদর্শনগুলো স্থান পাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধুই একটি শূন্য ভবন হিসেবে থেকে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এই জাদুঘরটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু এর ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং উদাসীনতার কারণে এখন প্রায় অকাজের হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সমন্বিত উদ্যোগে জাদুঘরটিকে কার্যকর স্মৃতি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।’
ঘুরতে আসা মো. আল আমিন ও রাতুল আহমেদ নামে দুজন বলে, স্কুলে পড়াশোনা করি। আমাদের চারঘাটে একটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর আছে শুনে দেখতে এসেছি। শুধু একটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচিহ্নই দেখতে পেলাম না।
সুজন মাহমুদ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলে, মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, শুধু বড়দের মুখে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি দেখতে এসে পুরোটাই হতাশ। মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচিহ্নই নেই। আমরা নতুন প্রজন্ম কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারঘাট উপজেলা সমিতির সভাপতি আল মামুন বলেন, ‘অনেকেই জানে না যে এই জাদুঘরটি রয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি বা নিদর্শনগুলো এই জাদুঘরে প্রায় অনুপস্থিত। জাদুঘরটি তার মূল উদ্দেশ্য হারাতে বসেছে। ভবনটি অরক্ষিত ও অযত্নে পড়ে আছে। এ জাদুঘরের প্রতি অবহেলা মানে আমাদের ইতিহাসকেই অবমূল্যায়ন করা। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও নিদর্শন সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা সুলতানা বলেন, ‘কিছু দিন আগে এখানে যোগদান করেছি। খোঁজখবর নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ করে জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’