নাগরিকত্ব
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ২০:৩২ পিএম
মোস্তাফিজার রহমান। ছবি : সংগৃহীত
প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৬ সালে প্রেমিকার হাত ধরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে কুড়িগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের মোস্তাফিজার রহমান। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেয়েটির সঙ্গে তিনি ঘর বাঁধেন কুড়িগ্রামের মাটিতে। তবে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে পুলিশ তাদের আটক করে। কুড়িগ্রাম জেলহাজতে পাঠানো হয় তাকে। প্রায় ছয় মাস জেলও খাটেন তিনি।
মোস্তাফিজার রহমান সম্পর্কে এরকমই জানাচ্ছেন কতিপয় স্থানীয় মানুষজন। তারা বলছেন, এ সব ঘটনাই মোটামুটি চাপা পড়ে গিয়েছিল। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির সাবেক সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তবে বিএনপিরই সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য মো. সহিদুল ইসলাম সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে এক অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ, তথ্য গোপন করে মোস্তাফিজার রহমান নামের ভারতীয় নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে গেছেন। প্রকৃতিপক্ষে মোস্তাফিজার ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমার সাহেবগঞ্জ থানার খুবিরের কুটি (চৌধুরীর হাট) গ্রামের মোজাহারুল হক ও মোছা. কবিজন নেছার পুত্র। এ নিয়ে সহিদুল ইসলাম গত মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামÑ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক উমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মোস্তাফিজার রহমান ভারতীয় নাগরিক এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে দীর্ঘ সময় তিনি কুড়িগ্রামে কিভাবে আছেন, নাগরিকত্ব কিভাবে পেলেন, সেটা জানি না। তিনি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন।’
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও কুড়িগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘তার জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, জন্মস্থান কুড়িগ্রাম। এটি তথ্য গোপনের শামিল। জন্ম নিবন্ধন সনদ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার কোনও আইন নেই। তিনি কিভাবে এনআইডি কার্ড পেলেন তা নির্বাচন কমিশন বলতে পারবেন।’
সাবেক মেয়র জানান, ‘ মোস্তাফিজার রহমানের এনআইডিতে উল্লেখ রয়েছে তার জন্মস্থান কুড়িগ্রাম। তিনি কুড়িগ্রাম পৌরসভার হাসপাতাল পাড়া এলাকার বাসিন্দা। আসলে আশির দশকে ডিজিটালাইজড সিস্টেম না থাকায় তথ্য গোপন করে তিনি কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হয়েছেন। কিন্তু এর আগে তিনি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সস্ত্রীক কুড়িগ্রাম জেলখানায় জেল খেটেছেন। কতৃপক্ষ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করলে বিষয়টি খোলাসা হবে।’
কুড়িগ্রাম -১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুর রহমান রানা বলেন, ‘কুড়িগ্রামের মানুষ অত্যন্ত সহজ সরল। মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা মোস্তাফিজারের বসবাসে সহযোগিতা করেছে। তবে তিনি যে ভারতীয় নাগরিক এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।’
তবে মোস্তাফিজার রহমানকে এসব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার মানসম্মান ক্ষুন্ন করার জন্য একটি মহল বিভিন্ন ভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আমার জাতীয় পরিচয়পত্র প্রমাণের জন্য প্রমাণাদি চাইলে আমি দিতে প্রস্তুত আছি।’
এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য দেওয়া অথবা তথ্য গোপন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা জরিমানা। অথবা অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কেউ উভয় দণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন। তথ্য গোপন করে এক ভারতীয় ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন মর্মে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন। তবে এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’