সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৮:১৫ পিএম
রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের চিম্বুক পাহাড়ে নিজের কফি-বাগানে ঙুইইন ম্রো। প্রবা ফটো
পাহাড়ে ফলদ বাগানের পাশাপাশি কফি চাষ করেছেন বান্দরবান চিম্বুক এলাকার বাসিন্দা ঙুইইন ম্রো। ভালো ফলন ও বাজারদর ভালো হওয়ায় কফি চাষে সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কফি একসময় শুধু শহরাঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে কফির চাহিদাও বাড়ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রজাতির কফি উৎপাদিত হলেও বান্দরবানে অ্যারাবিকা, রোবাস্তার পাশাপাশি চাষ হচ্ছে চন্দ্রগীরীর। অ্যারাবিকা ও রোবাস্তার চেয়ে উচ্চফলনশীল হওয়ায় চন্দ্রগীরী কফি চাষে ঝুঁকছেন বান্দরবানের অনেক চাষি।
জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় চিম্বুক পাহাড়ের ওপর ঙুইইন ম্রোর বাগান দেখতে সম্প্রতি সরেজমিনে যাওয়া হয়। রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বাবুপাড়া এলাকার পাহাড়ে ১০ একর পাহাড়ি জমিজুড়ে আম, জাম্বুরা, ড্রাগন, লিচুর পাশাপাশি ঙুইইন ম্রো আবাদ করেছেন কফির। কফিগাছগুলোয় ঝুলছে লাল-সবুজের সারি সারি কাঁচা-পাকা কফি চেরি।
ঙুইইন ম্রো জানান, ২০১৫ সালে এক আত্মীয়ের পরামর্শে ১ হাজার চন্দ্রগীরী কফিগাছের চারা রোপন করেন তিনি। বর্তমানে তার প্রায় ৪ হাজার চন্দ্রগীরী কফিগাছ রয়েছে। যার মধ্যে ১ হাজার গাছ থেকে বছরে প্রায় দেড় টন কফি চেরি পাওয়া যাচ্ছে। চেরি হিসেবে যার বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এই ১০ একর জমিতে চাষ করা ৪ হাজার গাছে একসঙ্গে কফির ফলন পাওয়া গেলে বছরে অন্তত ১০ টন কফি চেরির উৎপাদন হবে। যার বাজারমূল্য ১০ লাখ ২০ হাজার হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
ঙুইইন ম্রো বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে চারা রোপণ করা হয়। এর তিন বছর পর ফলন পাওয়া যায়। বছরে দুবার ফলন দেয়। তবে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরÑ এই তিন মাসে ফলন বেশি পাওয়া যায়। কফিগাছ পরিচর্চা করলে ৮০ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়। এ জাতের গাছে রোগবালাই কম এবং তেমন পরিচর্যা করতেও হয় না। ফলে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লাভও বেশি হয়।’
ঙুইইন ম্রো আরও বলেন, ‘আমার বাগানে আটশ আম, চারশ ড্রাগন, একশ জাম্বুরাগাছের ফল বিক্রি করে বছরে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়ে থাকি। সেখানে অন্যান্য গাছের মাঝামাঝি রোপণ করা কফিগাছগুলোর একাংশ থেকে পাওয়া চেরি থেকেই বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। সবমিলে এই কফি চাষেই ভবিষ্যতে ভাগ্য বদলাবে বলে আশা করি।’
কফি চাষ বিশেষজ্ঞ তৈদু রাম ত্রিপুরা জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে কফি নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন দেশে কফি চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে চিম্বুক-রোয়াংছড়ি-রুমা এলাকার কফিচাষিদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশে কফির চাহিদা বেড়েছে। উৎপাদিত কফি বিক্রিতে সিন্ডিকেট না থাকায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেয়ে থাকেন। দেশে কফির চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ার কারণে ইথিওপিয়া-ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও কফি আমদানি করা হয়। কফি ক্রয়-বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান নর্দান আ্যন্ড কফি রোস্ট কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় চাষিদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বান্দরবানে উৎপাদিত পাকা কফি ফল খোসাসহ প্রতি কেজি ১৭০ টাকা করে বিক্রয় করছেন কৃষকরা। জেলার চিম্বুক এলাকা, রোয়াংছড়ি, রুমা ও লামা এলাকায় চন্দ্রাগীরী কফির চাষ হচ্ছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এমএম শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘২০২০-২১ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নন বোর্ড ও তাদের সহায়তায় জেলাজুড়ে ২৫০ একর জমিজুড়ে অ্যারাবিকা ও রোবাস্তা জাতের কফির আবাদ শুরু হয়। সেই থেকে ক্রমান্বয়ে সাড়ে ৭ হাজার চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে ১ হাজার ৮৫০ একর জমিতে এই দুই জাতের কফির আবাদ হচ্ছে। যা থেকে একরপ্রতি ৭০০ কেজি শুকনো কফির বিন পাওয়া যাচ্ছে।’