চট্টগ্রাম ওয়াসা
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ০০:২৬ এএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ১১:০৯ এএম
উৎপাদিত ১৩৫ কোটি লিটার পানি থেকে প্রতি মাসে ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ এনআরডব্লিউ (নন রেভিনিউ ওয়াটার) বা সিস্টেম লস দেখাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। প্রতিষ্ঠানটিরই একটি অসাধু চক্র এভাবে সিস্টেম লসের নামে বছরে ১৫১ কোটি ২০ লাখ লিটার উৎপাদিত পানি বিক্রি করে অন্তত ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওয়াসার প্রায় প্রতিটি বোর্ড সভায় সিস্টেম লসের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতি মাসে উৎপাদিত পানির ২৮ শতাংশ সিস্টেম লস থেকেই যাচ্ছে। এই ‘পানি চুরি’র টাকা পকেটে ভরছে ওই চক্রের সদস্যরা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্য মতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার মোট সংযোগ সংখ্যা ৮৬ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে আবাসিক ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ সাত হাজার ৭৬৭টি। আবাসিক সংযোগের গ্রাহকরা এক হাজার লিটার পানি কেনেন ১৮ টাকায়। আর বাণিজ্যিক সংযোগের গ্রাহকরা এক হাজার লিটার ৩৭ টাকায় কিনে থাকেন। নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের এই ৮৬ হাজার সংযোগের জন্য স্থাপিত মিটার রিডিং দেখে পানির বিল লেখা এবং গ্রাহকদের বিলের কাগজ পৌঁছানোর মিটার পরিদর্শকের দায়িত্বে রয়েছেন ৩৭ জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ৩৭ জনের মধ্যে অসাধু মিটার পরিদর্শকের একটি চক্র কারসাজি করে এলাকাভিত্তিক উৎপাদিত পানি কৌশলে বিক্রি করে থাকেন। ওয়াসা থেকে যার বিল করা হয় না। টাকাটা মেরে দেন ওই মিটার পরিদর্শকরা। নগরীর বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, লালখানবাজার, দেওয়ানহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ও অনাবাসিক সংযোগের মালিকদের সঙ্গে কারসাজি করে এমন অবৈধ পন্থায় পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তাদের যত বিল আসার কথা তত বিল হয় না। তবে মাস শেষে ঠিকই বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেন অভিযুক্ত পরিদর্শকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াসার অনুমোদনক্রমে নতুন সংযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু যে তারিখ থেকে সংযোগ দিয়ে পানি ব্যবহার করা হয়, সেদিন থেকে বিল হয় না। পানির ব্যবহারকারীর সঙ্গে আর্থিক রফা করে সেই বিল করা হয় অন্তত চার থেকে ছয় মাস পর। এই ছয় মাসে ওয়াসার পানি ব্যবহার করলেও তার রাজস্ব পায় না কর্তৃপক্ষ। বিল ছাড়া থোক টাকা নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নেয় মিটার পরিদর্শক, আইসিটি বিভাগের কম্পিউটার প্রোগ্রামার, রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের একটি অসাধু চক্র।
আরও জানা যায়, গত এক যুগের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগপন্থি চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলামও এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে মাসোয়ারা পেতেন। তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। তবে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখনও ওয়াসায় কর্মরত রয়েছেন। পানি চুরিসহ ওয়াসার লুটপাট এখনও চলছে। আর সিন্ডিকেটে এখন যুক্ত হয়েছে বিএনপিপন্থিদের সংগঠন চট্টগ্রাম ওয়াসা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক-কর্মচারী দলের কয়েকজন নেতা। তাজুল ইসলামের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গত ১৫ বছর ধরে ওয়াসার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল জানিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী দলের কার্য্করী সভাপতি কামাল খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তাজুল সাহেব এখন পলাতক। অফিসে আসেন না। তারা ১৫ বছর ধরে নানা অনিয়ম করেছেন। তা ছাড়া পানি বিক্রি করে সিস্টেম লস করার চেয়ে লিকেজ মেরামতেই বেশি ব্যয় হয়। এর বাইরে শুনেছি দুয়েক জায়গায় নানাভাবে ওয়াসার পানি নিয়ে ব্যবসা হয়ে থাকে। আমার এরিয়া হচ্ছে পশ্চিম ফিরোজ শাহ আর আংশিক জামালখান। এখানে তেমন কোনো সিস্টেম লস নেই। তবে তাজুলের ভাই শহীদুল ইসলাম, বারেক বিল্ডিং এলাকার মিটার পরিদর্শক নজরুল ইসলাম, চান্দগাঁ আবাসিক এলাকার নাছির উদ্দিন ১, হামজারবাগ এলাকার নাছির উদ্দিন-২, মোহরা ও পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকার মীর লোকমান সিস্টেম লসের এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।’
আওয়ামীপন্থি মিটার পরিদর্শকের স্থলে বিএনপিপন্থিরা এখন সিস্টেম লসের নামে লুটপাট করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে প্রসঙ্গে কামাল খান বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী শ্রমিক-কর্মচারী দল এসব কাজে যুক্ত নয়। ওয়াসার গ্রাহকদের সেবা বাড়াতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে পানির সিস্টেম লসসহ নানা অনিয়ম-অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, গত ছয় মাস আগে মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৩ কোটি টাকার মতো বিল আদায় হতো। আর গত দুই মাস ধরে আদায় হচ্ছে ১৬ কোটি টাকার মতো। কম বিল আদায়ের পেছনেও নানা কারণ রয়েছে। সিস্টেম লসসহ ওয়াসার নানা অনিয়মে নুরুল আমিন চৌধুরী, মীর লোকমান, অহিদুল আলম, বেলাল উদ্দিন, মামুনুর রশিদ, এমএম হানিফ, আবুল হাশেম, আনোয়ার হোসেন চৌধুরীসহ অনেকে জড়িত। মিটার পরিদর্শকরা ছাড়াও ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেটের কাছে এসব বিলের ভাগ চলে যায়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়াসার ৩৭ জন মিটার পরিদর্শক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা ইরফান সাজ্জাদ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেটের অপকর্মের দায় তো আমাদের পুরো রাজস্ব বিভাগ নেবে না। আমি কোনো সিন্ডিকেটে নেই। ৪১টি ওয়ার্ডে মাত্র ৩৭ জন মিটার পরিদর্শক রয়েছেন। তারা বিল করে গ্রাহকদের কাছে বিলের কপি পৌঁছে দেন। এই জনবল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তারা কীভাবে এলাকায় এলাকায় ওয়াসার পানি বিক্রি করবে তা আমার জানা নেই। হয়তো দুয়েকজন এদিক-ওদিক করতে পারে। চারটি মডসের মাধ্যমে ওয়াসার পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর পানি সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব রাজস্ব শাখার নয়। অন্য বিভাগের দায়ভার রাজস্ব শাখার কর্মরতদের দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও কোনো মিটার পরিদর্শক যদি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তারা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ‘সিস্টেম লস কমাতে বোর্ড সভায় বারবার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। কিন্তু খুব একটা অগ্রগতি হয় না। কেননা প্রতি মাসে ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ সিস্টেম লসের কারণে গ্রাহকদের দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ কোটি লিটার পানির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই বিল পরিশোধ প্রক্রিয়াকে এখন অটোমেশনের আওতায় আনা জরুরি।’
কেন অগ্রগতি হয় না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৫০ থেকে ৫২ কোটি লিটার। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় দুটি, মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগার এবং গভীর নলকূপসহ বর্তমানে দৈনিক ৪৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে সক্ষম চট্টগ্রাম ওয়াসা। এসব উৎপাদিত পানি থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২৮ থেকে ৩২ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়ে যায়। এসব পানির অপচয় কমানো গেলে চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব যেমন বাড়বে তেমনি সব গ্রাহকের চাহিদাও পূরণ করা
সিস্টেম লসসহ নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে বলেন, ‘সিস্টেম লস দেখিয়ে যারা পানি অপচয়ের নামে ওয়াসার রাজস্ব আদায়ে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে; তাদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। এসব নিয়ে বোর্ড সভা থেকে কঠোর হতে বলা হয়ে থাকে। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন এলাকায় আমরা একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি। অভিযানে বেশ কয়েকটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার দায়ে তিনজন মিটার পরিদর্শককে শোকজ করেছি। পাশাপাশি সিস্টেম লসের নামে কেউ যাতে নয়-ছয় করতে না পারে; সেজন্য ডিজিটাল মিটার বসানোর কাজও চলছে। যে চক্রের কথা বলা হচ্ছে তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’