প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৫১ পিএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৫৪ পিএম
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার অজপাড়াগাঁ লক্ষ্মীপুরে জন্ম ডিপিডিসির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরাত। টিউশনি করে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন তিনি। এরপর চাকরি পান বিদ্যুৎ বিভাগে। এই চাকরিই হয়ে ওঠে তার ‘আলাদিনের চেরাগ।’ সর্বশেষ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি অবসর নেন বেহিসাবি সম্পদের মালিক হয়ে। গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামেও তিনি গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। সম্পদের তথ্য গোপন করতে চতুর এই স্বামী-স্ত্রী আয়কর রিটার্ন দাখিলেও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়াসহ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেলায়েত হোসেনের নামে ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ৩/এ রোডের ৫৬ নম্বর বাড়িতে রয়েছে ১৮০০ বর্গফুটের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (৩/এ/২ ও ৩/বি)। আয়কর রিটার্নে তিনি যার মূল্য দেখিয়েছেন ৯৪ লাখ ১৮ হাজার ৬০ টাকা। প্রকৃতপক্ষে ফ্ল্যাট দুটির বাজার মূল্য কমপক্ষে সাড়ে চার কোটি টাকা। একইভাবে খিলগাঁও থানার উলন মৌজায় ০৮২৫ অযুতাংশের অর্ধেক ৪১২.৫ অযুতাংশÑযার মূল্য তিনি দেখিয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে এর বাজারমূল্য প্রায় কোটি টাকা। একই মৌজায় ২.৮ কাঠা নাল জমির মূল্য দেখিয়েছেন ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে যার বাজার মূল্য ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। স্ত্রী শামসুন নাহারের নামেও রয়েছে ৪৪/এ হাজীপাড়ায় এবং হাজী লেন রামপুরায় দুই কোটি টাকার জমি।
আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেনি এমন অনেক সম্পদও রয়েছে এই দম্পতির। ঢাকার আফতাব নগরে রয়েছে ৫ কাঠা ও ১০ কাঠার দুটি প্লট। এ ছাড়াও ডেমরা, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরে রয়েছে নিকট আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা কয়েক বিঘা জমি। ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে কোটি কোটি টাকা। তার মধ্যে সঞ্চয়পত্রই রয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার। নিকট স্বজনদের দিয়ে তিনি করাচ্ছেন বিভিন্ন ব্যবসাবাণিজ্য। এর মধ্যে গার্মেন্টসের ব্যবসা করান আপন বোন নাজমুন নাহার ও ভগ্নিপতি কামরুজ্জামানকে দিয়ে। গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামেও রয়েছে একাধিক জমি। এ ছাড়া শামসুন নাহারের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে কয়েক লাখ টাকার এফডিআর। এই দম্পতির বিরুদ্ধে রয়েছে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেলায়েত হোসেনের স্ত্রী শামসুন নাহার ও একমাত্র কন্যা ফারিয়া হোসেন মুমুর নামে রয়েছে ৩০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। বেলায়েত হোসেন ও তার পরিবার ব্যবহার করেন দুটি গাড়ি। এর মধ্যে এক্স করোলা ব্র্যান্ডের (ঢাকা মেট্রো গ ২৬-৫৪৮৩) একটি দামি গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করা আছে তার নিজের নামে। একই ব্র্যান্ডের অন্য গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-গ ১৯-৪৮৩৮) গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে কিনে রেজিস্ট্রেশন করা হয় বিআরটিএ-তে। পরে আমেরিকা প্রবাসী আপন চাচা শ্বশুর মো. ইয়াকুব আলী শরিফের ছেলে বেলায়েত হোসেনের চাচাতো শ্যালক রুবায়েত শরিফের নামে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন ট্রান্সফার করা হয়। যদিও গাড়িটি তারাই ব্যবহার করে থাকেন।
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত দুর্নীতিবাজ বেলায়েত হোসেন চাকরিজীবনে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন তার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন নানা পদ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার একাধিক ঘনিষ্ঠজন বলেন, আয়কর রিটার্ন দাখিলে বেলায়েত হোসেন যে পরিমাণ সম্পদ ও অর্থ দেখিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তার কয়েকশ গুণ বেশি সম্পদ-সম্পত্তি ও অর্থ রয়েছে তার। বেলায়েত হোসেনের গৃহিণী স্ত্রী এবং স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল শামসুন নাহারের দৃশ্যমান কোনো আয় না থাকলেও রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। তিনিও স্বামী বেলায়েত হোসেনের মতো আয়কর রিটার্নে নিয়েছেন জালিয়াতির আশ্রয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে বেলায়েত হোসেন ও তার স্ত্রী শামসুন নাহারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।