× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সার সিন্ডিকেটের ১৫ বছর, নাজেহাল চাষি

ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:০১ পিএম

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:৩২ পিএম

সার সিন্ডিকেটের ১৫ বছর, নাজেহাল চাষি

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং ডিএপি সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তির নামে ডিলারশিপ প্রদান, ডিলার নিয়োগ নীতিমালা-২০০৯ উপেক্ষা করে অনিয়মের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ, অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতাদের সময়মতো ও প্রয়োজনমতো সার না দেওয়া এবং অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় বিসিআইসির সারের ডিলারশিপ নিয়োগ দেয় সরকার। এ ছাড়া সে সময়ে এসব এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার্থে আরও ৬৪ জন খুচরা সার বিক্রেতাও নিয়োগ করা হয়। তৎকালে ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও হয়েছিল বিশাল ঘাপলা। যারা ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নে, একজনের বাড়ি ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নে, একজনের বাড়ি ১ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নে, একজনের বাড়ি ৫ নম্বর কালাপুর ইউনিয়নে এবং একজনের বাড়ি ৬ নম্বর আশীদ্রোন ইউনিয়নে। অভিযোগ রয়েছে, যে দশজন সারের ডিলারশিপ নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের ছাড়া নিয়োগকালে আর কাউকে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। যারা নিয়োগ পেয়েছিলেন তারা তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টির কর্মী-সমর্থক। ফলে ওই দশজনই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় বিসিআইসির সারের ডিলারশিপ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ওই দশ ডিলারের মধ্যে আবার একই পরিবারের একাধিক ডিলারও রয়েছেন। ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন এলাকার ডিলার অনুকূল চন্দ্র দাশের আপন ভাই পরিমল দাশ ৯ নম্বর সাতগাঁও ইউনিয়ন এলাকার ডিলার। অপরদিকে ৬ নম্বর আশীদ্রোন ইউনিয়ন এলাকার ডিলার স্বপন কপালী ও ৮ নম্বর কালীঘাট ইউনিয়ন এলাকার ডিলার শান্ত কপালী পরস্পরের আত্মীয়। পরিমল দাশের ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন অনুকূল চন্দ্র দাশ এবং শান্ত কপালীর ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন স্বপন কপালী।

ডিলারদের মধ্যে শ্রীমঙ্গল পৌর এলাকার ডিলার মোমিনুল হোসেন সোহেল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, ১ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়ন এলাকার ডিলার হাজী মস্তান মিয়া ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি, ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়ন এলাকার ডিলার অর্পনা দেব আওয়ামী লীগ ঘরানার। তার ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন তার ছোট ভাই ভুনবীর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত দেব। বাকি সকল ডিলার আওয়ামী ঘরানার হলেও দলে তাদের পদপদবি নেই।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ এর ৩ ধারার ৩.২ উপধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘নিজ মালিকানায় অথবা ভাড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভায় বিক্রয়কেন্দ্রসহ কমপক্ষে ৫০ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন গুদাম থাকতে হবে।’ কিন্তু শ্রীমঙ্গলের কোনো ইউনিয়নেই কোনো বিসিআইসি সার ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র এবং ৫০ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন গুদাম নেই। প্রায় সব ডিলারেরই বিক্রয়কেন্দ্র ও গুদাম পৌর এলাকায় অবস্থিত। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ উপেক্ষা করে প্রায় সকল ডিলারই তাদের বিক্রয়কেন্দ্র ও গুদাম পৌর এলাকায় স্থাপন করায় তারা (খুচরা বিক্রেতা) পৌর এলাকা থেকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে সার নিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে বিক্রি করতে হয়। পরিবহন খরচ বহন করতে হয় তাদের। এতে সারের গড়মূল্য বৃদ্ধি পায়। আবার যখন কৃষির মৌসুম, তখন কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ডিলাররা তাদের সার সরবরাহ করেন না। ওই সময়ে তারা বাইরে সার অনৈতিকভাবে বিক্রি করেন। ফলে কৃষির মৌসুমে জেলার বাইরে থেকে অধিক মূল্যে তাদের সার ক্রয় করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ করে মৌসুমে অনেক সময় ক্ষতির শিকার হন তারা। 

গত ১৫ বছর ধরে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে কৃষি অধিদপ্তরের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এক ডিলার একাধিক লাইসেন্সের অধীনে সার উত্তোলন করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চড়া দামে বিক্রি করছে। উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের খুচরা সার বিক্রেতা এম.এ. রহিম, মো. নায়েব আলী, মো. ছাখাওয়াত হোসেন, মো. শফিকুল আলম রুনু, অনুকূল দেবনাথ, মো. উছমান, মো. কবির মিয়া, বদরুল আলম জামিল ও সাইফুর রহমান মুহিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে তারা উল্লেখ করেন, তাদের ইউনিয়নে একজন বিসিআইসি ডিলার আছেন। তার কাছ থেকে তারা ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের খুচরা বিক্রেতারা এক বছর ধরে কোনো সার পাচ্ছেন না। যখন পান, তখন অতিরিক্ত দামে কিনতে হয়। এই ডিলারের বাড়ি তাদের সিন্দুরখান এলাকায় নয়। তাদের ইউনিয়নের এলাকায় তার কোনো দোকান বা গুদাম নেই। তাদের শ্রীমঙ্গল গিয়ে সার আনতে হয়। আবেদনে তারা ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার বাতিল করে সিন্দুরখান এলাকার কারও নামে বিসিআইসির সার ডিলার দিতে ইউএনওকে অনুরোধ করেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ঘুরে এক ইউনিয়ন ছাড়া আর অন্য কোনো ইউনিয়নে কোনো ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র ও গুদাম পাওয়া যায়নি। সেটা হলো ১ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মস্তান মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের খুচরা সার বিক্রেতাদের সব সময় প্রয়োজনমতো সার সরবরাহ করে আসছি।’ তবে এখানেও কিছু সংকট রয়েছে। ইউনিয়নের ধোবারহাট বাজারের অনুমোদিত খুচরা সার বিক্রেতা ইলাছ মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ডিলারের কাছ থেকে প্রায় সময়ই সার পাই না।’ তবে ডিলার মস্তান মিয়া দাবি করেন, ‘আমার ইউনিয়নে কেউ যদি সার পাচ্ছে না বলে থাকে তবে তা সত্য নয়।’

এসব ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘সিন্দুরখান ইউনিয়ন থেকে খুচরা সার বিক্রেতাদের একটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আরও কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে রয়েছে। অনেক বিষয় আমাদেরও অজানা নয়। এসব বিষয়ে আমাদের উপজেলা পরিষদের সভায় আলোচনা করব। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভাঙতে আমরা বড় আকারে মাঠে নামব। যদি সার বিতরণ বা বরাদ্দে কোনো অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, বেশি দামে সার বিক্রি হয় বা এক ব্যক্তি একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে থাকেন, তবে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু তালেব বলেন, ‘সার বিক্রিতে বা অন্য কোনো বিষয়ে অনিয়মের তথ্য পাইনি। এখন বিষয়টি আপনার কাছ থেকে শুনলাম। এ বিষয়ে এখনই খোঁজ নিচ্ছি। খোঁজ নিয়ে যদি কারও বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা