ঠাকুরগাঁও প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৪০ পিএম
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৪৯ পিএম
১৯৮০ সালে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমির সেচ সুবিধার জন্য ঠাকুরগাঁও সদর আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মাঝামাঝি একটি জলকপাট নির্মাণ করা হয়। আর সেই জলকপাটে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়। আর এই পোনাগুলোর দেখ ভাল করে আকচা ও চিলারং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্যরা।
সোমবার (১৪ অক্টোবর) রাতে বুড়ির বাঁধের জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয় আর মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) সকাল থেকে চলে মাছ ধরা মহাউৎসব। এতে অংশ নেয় জেলার মানুষজন ছাড়াও আশপাশের জেলার মানুষ। পলো, ঠেলা, বাদাই, খেয়া, টানা, ফিকা, কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার নানান উপকরণ। এদের বেশিরভাগই শৌখিন মাছ শিকারি।
আকচা উইনিয়নের বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর এই সময় বুড়ি বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা সবাই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠি। এখানে অনেক দেশি মাছ পাওয়া যায়। মাছ ধরতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা আসে। ফিকা জাল দিয়ে কলা গাছের ভেলায় মাছ ধরছে নাজমুল হক তিনি বলেন, কালকে রাত থেকে মাছ ধরছি। যা মাছ পাইছি তাতে সারা রাতের কষ্ট সার্থক।’
উপজেলা পীরগঞ্জ থেকে বুড়ির বাঁধে মাছ ধরতে আসা মাহাবুব হোসেন বলেন, ‘গতকাল রাতে আমি মাছ ধরতে আসছি। রাতে পানি বেশি থাকা নামিনি বাঁধে। সকাল ৬টায় নামছি। এখন পর্যন্ত ছোট বড় মিলে ৩/৪ কেজির মত মাছ পাইছি। আমি শুধু না আমার এলাকার আরও বেশ কয়েকজন আসছে। আমরা মূলত শখের কারণে আসি। আর কিছুক্ষণ থাকব।। যা পাইছি তাতে খুশি।’
শহরের গোয়াল পাড়া থেকে মাছ ধরতে গেছেন বাবু রহমান তিনি বলেন, শহরের কয়েকজন বন্ধু মিলে জাল কিনে মাছ ধরতে আসছি। তবে বড় মাছ না পেলেও ছোট মাছ ধরছি অনেক। মূলত শখের বসে আসা। তবে মাছ ধরার আনন্দ অনেক। হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরছে এখানে।
পঞ্চগড় থেকে আসা ওসমান গণি বলেন, বুড়ির বাঁধে মাছ ধরের কথা অনেক শুনছি। তাই দুই ভাই শখ করে মাছ ধরতে আসছি। এখন পর্যন্ত চার কেজির মত মাছ ধরছি। তার মধ্যে বড় রুই মাছ হবে ২ কেজি আর ছোট মাছ হবে দুই কেজির মত।
সদর নারগুন ইউনিয়নের বসির আহম্মেদ বলেন, আগের মত বাঁধে আর মাছ নাই। বাঁধ ছাড়ার আগে ছিপ দিয়ে বড় সব মাছ তুলে ফেলে আশাপাশের মানুষজন। ঝাড় দিয়ে সব জায়গা দখল করে রেখেছে স্থানীয় কিছু লোক। তাও বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার মানুষ প্রতিবছর এইখানে মাছ ধরতে আসে। কেউ পায় বেশি কেউ অল্প। এখন বুড়িরবাঁধ মাছ ধরার উৎসবে পরিণত হয়েছে।
আকচা ইউনিয়নের পরিমল পাল বলেন, প্রতি বছর চলে এই মাছ ধরা উৎসব। মাছ ধরতে জাল, খইয়া জাল, পলো ও মাছ রাখার খালুই নিয়ে গ্রাম ও শহরসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ মাছ ধরতে আসে। যাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম নাই তারা ধরে হাত দিয়ে। এক কথায় বুড়ির বাঁধ এলাকা পরিণত হয় মিলন মেলায়।
বুড়িরবাঁধে মাছ কিনতে আসা আইনুল হক বলেন, আমি ৮ টার দিক আসছি এইখানে দেশি মাছ কিনতে। দুই কেজি পুটি মাছ কিনছি ৫০০ টাকা দিয়ে। আর বড় মাছ রুই কিনছি দুই কেজি ৬০০ টাকায়। প্রতি বছর এইখানে মাছ ধরার উৎসব হয় আর বিভিন্ন শ্রেণীর পেশার মানুষ মাছ ধরে। অনেকে শখ করে আসে মাছ ধরতে।
কালিবাড়ি বাজার থেকে মাছ কিনতে গেছেন প্রবীর রায়, তিনি বলেন, আমি মাছের ব্যবসা করি কালিবাড়ি বাজারে আমার মাছের দোকান আছে। যারা নিয়মিত মাছ ধরে আমরা তাদের কাছ মাছ কিনে নিয়ে বিক্রি করি যারা মাছ পায় না তারা আমাদের কাছ থেকে মাছ কিনে বাড়ি নিয়ে যায়। তবে আগের তুলনায় মাছ অনেক কম এইবার মাছের দাম একটু বেশি।
ঠাকুরগাঁওয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ৫০ একর এলাকাজুড়ে সুক নদীর ওপর নির্মিত বুড়ির বাঁধ মৎস্য অভয়াশ্রম। সারা বছর কাউকে এখানে মাছ ধরতে দেওয়া হয় না। আমাদের কর্মকর্তরা সব সময় এটা তদারকি করেন। শুধু জমানো পানি ছেড়ে দেওয়ার পর এ সময়ই মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়। এ বছর এখানে বিভিন্ন জাতের ৪০ কেজি মাছের রেণু ছাড়া হয়েছিল।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সারোয়ার চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি বছরের কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহে বুড়িরবাঁধের জমানো পানি ছেড়ে দেওয়া হয় এবং মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আমাদের ইউপি সদস্যরা বুড়িবাধঁ এলাকা দেখাশোনা করে। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে এখানে মাছ ধরতে। ছোট, বড় সব ধরণের মাছ পাওয়া যায় এখানে। এটা উৎসবে পরিণত হয়।’