বেতাগী
সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:২৫ এএম
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ১০:৫১ এএম
ঘূর্ণিঝড় রেমালের জলবায়ুর প্রভাবে বিষখালী নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে তলিয়ে যাওয়া বরগুনা বেতাগী পৌরসভার লঞ্চঘাট এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলার বাসিন্দাদের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা এখন নিত্যসঙ্গী। খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি আছেই। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও সচেতনতার অভাবে সংকেতের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা না বোঝায় শঙ্কিত তারা। তবু জনগোষ্ঠীর মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই।
জলবায়ুর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে উপজেলার বিষখালী নদী, খাল-বিল ও পুকুরে পানি বাড়ছে। জনপদটির ওপর দিয়ে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও রেমালের সময় মানুষ বিপদসংকেত পেলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কেননা সংকেত বা বিপদ সংকেতে করণীয় বা কী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়Ñ তা বুঝে উঠতে পারে না বেশিরভাগ মানুষ। এ কারণে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারে না। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়।
বিষখালী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের গ্রামাদ্দন গ্রাম। গ্রামটির বেশিরভাগ বাসিন্দা দুর্গম এলাকার হওয়ায় দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের মাঝে কোনো প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় না।
স্থানীয়রা জানায়, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় বিপদসংকেতকে গুরুত্ব না দেওয়ায় ওই গ্রামের তিনজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে একই পরিবারের দুজন মারা যায়। বাড়ির কাছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও সেখানে না যাওয়ায় ঘরের ভেতরেই গাছের চাপায় তাদের মৃত্যু হয়।
ওই এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, ‘নিম্নচাপ হলে সপ্তাহ ধরে আকাশ ভারী থাকে। বৃষ্টি ও ঝড় হয়। কিন্ত মানুষ বুঝে উঠতে পারে না কোন সময় কী করবে।’
অবশ্য দুর্যোগকালীন মহাবিপদ সংকেত বাজিয়ে মানুষকে সতর্কবার্তা প্রচারের জন্য এখানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি পলিফোনিক সাইরেন স্থাপন করা হয়। কিন্ত ঘূর্ণিঝড়ের সময় কোনো কাজে আসছে না উপজেলাবাসীর। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সঙ্গে স্থাপিত যন্ত্রটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
উপজেলার পৌরসভাসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক জনপ্রতিনিধি জানান, প্রলয়কাণ্ড ঘটলেও এখানকার মানুষ সচেতন নয়, সতর্কবার্তার অর্থও বুঝতে পারে না তারা। তাই সংকেত থাকলেও এ সময় দুর্যোগ থামার অপেক্ষা করতে থাকে তারা। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই তারা মনে করে আর কিছু হবে না। ফলে আগের দেওয়া সতর্কবার্তা সঠিন নয় বলে মনে করে নিরাপদ স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকে তারা।
উপজেলা যুব রেড ক্রিসেন্টের দলনেতা সোহেল মীর বলেন, ‘এখানে স্থানীয়ভাবে সংকেত পৌঁছানোর আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে ঝড়ের সময় সংকেতগুলো আমাদের মাধ্যমে কিংবা উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, মসজিদ ও মন্দিরের মাইকেও প্রচার করা হয়।’
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) জেলা টিম লিডার জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, ‘এ উপকূলের নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারে কখনও কখনও ১৫ থেকে ১৮ ফুটের বেশি পানি বাড়ে। তবু ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দেওয়া হলেও সবার টনক নড়ে না। তাই এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় উদ্যোগে ঝড়ের সময় বারবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার কথা বললেও ঘরবাড়ি রেখে এবং সংকেত কিংবা বিপদসংকেতের ভয়াবহতা বুঝতে না পেরে শেষ পর্যন্ত লোকজন ঘরেই থাকতে চায়। বেশিরভাগ মানুষ সংকেত, সতর্কসংকেত, দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত বা নম্বর অনুযায়ী সংকেতÑ এগুলোর মধ্যে পার্থক্যও জানে না। ফলে ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে বিপদের মধ্যে পড়তে হয় তাদের।
উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমদ বলেন, ‘এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা, জনপ্রতিনিধি ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে। মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পাশাপশি বেসরকারি সংস্থাকেও এগিয়ে আসতে হবে, যাতে দুর্যোগকালে মহাবিপদ সংকেত বাজিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা দেওয়া যায়। এজন্য অকেজো সাইরেনটি সারানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’