বাকপ্রতিবন্ধী বাবা-ছেলে
রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:০৬ পিএম
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:৩৩ পিএম
বাকপ্রতিবন্ধী বাবা মো. হাবিব ও ছেলে।
সাধারণ মানুষের মতো বাবা-ছেলে সুন্দরভাবে দোকান
পরিচালনা করছে। তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে কথা বলতে ও কানে শুনতে পারে না। ক্রেতা
আসছে, বসেছে, স্বাভাবিক নিয়মে চা-নাশতা খেয়ে চলে যাচ্ছে। বিক্রেতাও স্বাচ্ছন্দ্যে সবকিছু
পরিবেশন করছে। ক্রেতাদের ইশারা আর ঠোঁটের ভাষা বুঝে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বেচাকেনা
করছে তারা। এমন প্রতিভায় বিস্মিত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের
ফকদনপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. হাবিব। জন্মগত বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী তিনি। পৌর শহরের
রোড সুগার মিল গেটের বিপরীতে বাবার মুদি দোকান। ছোটবেলা থেকে থাকতেন মুদি দোকানে। বাবা
মারা যাওয়ার পরে নিজে শুরু করেন দোকান। বিয়ের পরে এক ছেলে ও মেয়ের বাবা হয়েছেন। মেয়ে
কানে শুনতে পেলেও কথা বলতে পারে না। আর ছেলেও কানে শুনতে পায় না আর মুখে কথা বলতে পারে
না।
সকালে বাড়ির কাজ শেষ করে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে
দোকানে আসেন। বাবা-ছেলের সমন্বয়ে চলে বেচাকেনা। দোকানের প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে নিয়ে
আসে ছেলে। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আবার কথাও বলেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। দোকান থেকে
কেউ বাকি নিলে সেটিও লিখে রাখে বাবা-ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকাশ আলী বলেন, ‘অনেক দিন
থেকে বাবা-ছেলে দোকান করছে। এ ধরনের মানুষরা মূলত ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু
তারা পরিশ্রম করে জীবনধারণ করছে। এলাকার মানুষও তাদের দোকান থেকে মালামাল কেনে।’
ক্রেতা পুলক রহমান বলেন, ‘বাবা-ছেলেকে প্রথমে
দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা কথা বলতে পারেন না বা কানে শুনেন না। তবে ইশারা দিলে সব
বোঝেন। তাদের ব্যবহার অনেক ভালো। কারও কথায় বিরক্ত হন না বা রাগ করেন না। এখানে ওদের
সঙ্গে একটু মজা করার জন্যই চা খেতে আসি। তারা দুজনে এমন অক্ষম হওয়ার পরেও কাজ করে জীবিকা
নির্বাহ করছেন। এখন সকলে যদি তাদের একটু সহযোগিতা করে তাহলে তার দুই সন্তানের পড়াশোনা
ভালোভাবে হবে।’
স্থানীয় শিক্ষক আবু রায়হান বলেন, ‘বাবা-ছেলের
মেধা দেখে আসলে হতবাক। ইশারায় আমাদের ভাষা বুঝে ফেলে তারা। লাল চা, দুধ চা নাকি পান
সবই বোঝে ইশারায়। অনেক প্রতিবন্ধী অন্যের কাছে হাত পেতে চললেও তারা হয়ে উঠেছে অনন্য
উদাহরণ। তাদের পরিবারে অনেক অভাব। একটা ছোট্ট দোকান করে চলতে হয় তাদের। ছেলে, মেয়ে,
বাবা তিনজনই প্রতিবন্ধী। মেয়েটা ছোট, চিকিৎসা করলে হয়তো ভালো হবে। সরকার যদি পরিবারটার
পাশে দাঁড়ায় তাহলে ভালোভাবে চলতে পারে।’
হাবিবের স্ত্রী আফরোজা আক্তার বলেন, ‘১১ বছর
আগে হাবিবের সঙ্গে বিয়ে হয় আমার। দুই সন্তানও কথা বলতে পারে না। ইশারা আর ঠোঁটের ভাষা
বুঝে তাদের সঙ্গে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। স্বামী ও ছেলের প্রতিবন্ধী ভাতা হলেও মেয়ের
হয়নি। মেয়েটা বড় হলে বিয়ে দিতে হবে। তাই চিকিৎসা করাতে চাচ্ছি, যদি কিছুটা হলেও ভালো
হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। সরকার ও বিত্তবানরা আমাদের পাশে দাঁড়ালে
চিকিৎসা করতে পারতাম।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাজেদুর রহমান বলেন, ‘ইউনিয়ন
পরিষদ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করে পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা করছি। বাবা ও ছেলেকে
প্রতিবন্ধী কার্ড, টিসিবির কার্ডসহ যা সুযোগ রয়েছে তা দেওয়া হচ্ছে। মেয়েটারও এবার প্রতিবন্ধী
কার্ড করে দেওয়া হবে।’
সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সারোয়ার মুর্শিদ
আহমেদ বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছি। ক্ষুদ্রঋণ সহায়তাসহ মেয়ের প্রতিবন্ধী
ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। পরিবারটির পাশে সব সময় থাকবে সমাজসেবা অধিদপ্তর।’