লোভাছড়ার ভাঙন
কাওছার আহমদ, সিলেট
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:৪৭ পিএম
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:৫১ পিএম
ভাঙনের শঙ্কায় লোভাছড়ার দক্ষিণ পাড়ের শত বছরের নয়াবাজার। সম্প্রতি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার মুলাগুল এলাকা। প্রবা ফটো
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া কোয়ারিতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের খেসারত দিচ্ছে লোভাপাড়ের বাসিন্দারা। লোভা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাড়ি, বাজার, ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা। হুমকির মুখে রয়েছে উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের সাত-আটটি গ্রাম।
খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞায় অবশ্য পাঁচ বছর ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এর আগে অবৈধভাবে নদীর তীর কেটে ১০০-১৫০ ফুট গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন করার ফলে নদীর দুই তীরে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ি ঢল ও নদীর প্রবল স্রোতে ভাঙতে থাকে নদীর তীর। আর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা।
সরেজমিন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোভা নদীর উত্তর পাড়ে কয়েকশ বছরের প্রাচীন মুলাগুল বাজারটি নদীভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে। বাজারের মূল অংশটি ৬-৭ বছর আগে নদীতে তলিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা বাজারের উত্তর পাশের ফসলি জমিতে দোকান বসিয়ে কোনো রকমে টিকিয়ে রেখেছে। একইভাবে ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হওয়ার পথে লোভার দক্ষিণ পাড়ের নয়াবাজারটিও। গত ৭-৮ বছরের ভয়াবহ ভাঙনে এ বাজারের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
মাসখানেক আগে আবার ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে বাজারটি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, হঠাৎ সন্ধ্যার সময় বিকট শব্দ করে বাজারের একটি গলির অন্তত সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীতে তলিয়ে যায়। আরও ৮-১০টি দোকান ভাঙনের কবলে পড়ে ঝুলে রয়েছে। এ ছাড়া হুমকির মুখে রয়েছে বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট।
ভাঙনের শিকার বাজারের ব্যবসায়ী শাহিদ আহমদ জানান, বাজারে তার ফার্নিচার ও ভুসিমালের ব্যবসা ছিল। মাসখানেক আগের ভাঙনে তার ফার্নিচারের শোরুম ও ভুসিমালের দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে অন্তত ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে নয়াবাজারে ভয়াবহ নদীভাঙনের খবর পেয়ে ছুটে যান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে স্থানীয় বিএনপি নেতারা সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি জানার পর পাউবোর কর্মকর্তারা ভাঙনস্থল পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক মাটির বস্তা ফেলে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
দুই বাজার ছাড়াও নদীতে বিলীন হয়ে যায় বহু বছরের পুরোনো কোনাপাড়া জামে মসজিদ। কয়েক বছর আগে নদী গ্রাস করলে স্থানীয়রা নতুন করে আবার মসজিদ নির্মাণ করে। এ ছাড়া মুলাগুল অঞ্চলের সতিপুর, কান্দলা, ভালুকমারা, বড়গ্রাম, সাউদগ্রাম, বাজেখেলসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি হুমকির মুখে রয়েছে।
মুলাগুলের বাসিন্দা খসরুজ্জামান পারভেজ বলেন, ‘পাহাড়ি ঢল ও বন্যার তাণ্ডব থেকে মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য লোভার দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। পাশাপাশি অব্যাহত নদীভাঙন রোধে ব্লকও বসাতে হবে। নতুবা জনবসতি, হাটবাজার সবকিছু ঝুঁকিতে রয়ে যাবে।’
পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, সম্প্রতি নদীভাঙনে কানাইঘাটের লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের নয়াবাজারের কয়েকটি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিষয়টি জানার পর ভাঙনস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক পর্যায় মাটির বস্তা দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর ব্লক বসিয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অরক্ষিত লোভাছড়া কোয়ারিতে রাতের আধারে অবাধে লুটপাট চলছে। সরকারের সঠিক নজরদারির অভাবে কিছুসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ী-শ্রমিক এ কাজ করছেন। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে, পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে পরিবেশও। তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, কোয়ারিগুলো রক্ষার্থে নিয়মতি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞায় কোয়ারি বন্ধ রয়েছে। এরপরও কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাথর উত্তোলন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে।’