শেরপুর ও ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ২০:৪৬ পিএম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ২০:৪৮ পিএম
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সবক’টি পাহাড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে মহারশি, চেল্লাখালি ও ভোগাই নদের বাঁধের অন্তত সাত স্থান ভেঙে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর ও নালিতাবাড়ী পৌর এলাকাসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায়ও টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আমনের ক্ষতিসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৫২৫ সেন্টিমিটার এবং ভোগাই নদের পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মহারশি, সোমেশ্বরী, মৃগী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩২০ মিলিমিটার। চলমান পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জেলার আমন আবাদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষকরা।
এ ছাড়া মহারশি নদীর খৈলকুড়ায় তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙে ও বাঁধ উপচে প্রবল বেগে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজার ও উপজেলা পরিষদ প্লাবিত হয়েছে। নালিতাবাড়ীর শিমুলতলা, ঘাকপাড়া, মন্ডলিয়াপাড়া ভজপাড়া ও সন্ন্যাসীভিটায় ভোগাই এবং চেল্লাখালীর বাঁধ ভেঙেছে। নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে শেরপুর-নালিতাবাড়ী ভায়া গাজিরখামার সড়ক। এ ছাড়া জেলার প্রতিটি শহরের জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়েছে হাজারো মানুষ। পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীর অন্তত ১০টি ইউনিয়ন। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির উঠতি আমন ফসল। রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে স্থানীয়রা। বাড়িঘরে পানি ওঠায় রান্না করতে না পারায় এসব এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইগাতীর পৌর শহরের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, এর আগে এরকম পানি কখনও দেখিনি। আমাদের বাড়িঘরে পানি। রান্না করতে পারছি না। রাস্তায় পানি ওঠায় চলাচলও করতে পারছি না।
ঝিনাইগাতী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের দোকানপাটে পানি উঠেছে। অনেক ব্যবসায়ীরই ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছরই নদীর বাঁধ ভাঙে আর আমাদের ক্ষতি হয়। কেউ এদিকে দেখে না। নদীর স্থায়ী বাঁধ চাই আমরা।
কৃষক ধানেশ মিয়া বলেন, আমাদের সব ফসল পানির নিচে। এই ধান এহন খাইয়া গেলেগা আমরা বাচমু কেমনে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার কৃষি অফিসার হুমায়ুন দিলদার জানান, এ বছর ঝিনাইগাতীতে সাড়ে চৌদ্দ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ও সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির আমন ধানের আবাদ আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে। দ্রুত পানি নেমে না গেলে অনেক ক্ষতি হবে।
এদিকে দুই দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় আমনের ফলনের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। তলিয়ে গেছে কৃষকের সদ্য রোপণকৃত আমন ফসল। ইতোমধ্যে নেতাই নদের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে বড় বন্যার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।
টানা বর্ষণে উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, গামারীতলা, ঘোষগাঁও, পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়নের অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে পানির পরিমাণ। ইতোমধ্যে নিম্নাচলের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে গেছে পুকুর এবং মাটির রাস্তা।
কৃষক আছমত আলী বলেন, ‘সকালে ক্ষেত ভাসা ছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এহন আমরা কী করে বাঁচব?’
ঘোষগাঁও ইউনিয়নের আবুল বাশার শিমুল বলেন, নেতাই নদের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে নদীর আশেপাশের বাড়িগুলোতে পানি প্রবেশ করেছে। বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ নেতাই নদ থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাড় ভেঙে ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরোয়ার তুষার বলেন, কিছু কিছু জায়গায় ফসল নিমজ্জিত হওয়ার তথ্য পেয়েছি। উজান থেকে ঢলের পানি এলে ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষক।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত শারমিন বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি যাদের বাড়িঘরে পানি রয়েছে তাদের পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনে আশ্রয় দিতে। সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছি।