বন্যা ও ভাঙন
ড. মো. জিল্লুর রহমান
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:২০ পিএম
৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরে প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে, তবে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। চলতি বছর বন্যা বিশ্বজুড়েই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এবারের বন্যার একটি বড় কারণ অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে লঘুচাপের কারণে প্রবল বর্ষণ হয়েছে এবং এখনও দেশটির অনেক স্থানে ভারী বর্ষণের ফলে বন্যা ও ভূমিধস চলছে। দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টির কারণেও বন্যা বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-বিগত কয়েক বছর বন্যা বাড়ার পেছনের কারণ কী? মনে রাখতে হবে, দেশের নদ-নদীগুলোর উৎপত্তিস্থল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভারত, নেপাল, ভুটান এবং ক্ষেত্রবিশেষ চীন। এসব নদ-নদীর অববাহিকা বিশাল অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত। এ অঞ্চলসমূহে যখন প্রবল বৃষ্টিপাত হয় তখন নদীতে যে পরিমাণ পানি নেমে আসে সেই পানি নদীর পক্ষে ধারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানির চাপ পড়ে এবং অকস্মাৎ বন্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পায়। তবে এখন সারা বিশ্বেই জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে এবং বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে। এলনিনো আর এলনিনার প্রভাবে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এরই ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অতিবর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্রবল স্রোতে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদীগুলোয় দেখা দিয়েছে ভাঙন। মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয় উঁচু স্থান ও বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছে। ওই অঞ্চলে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট। তিস্তার পানি গত এক দিনে ৩৯ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদী অববাহিকার চরাঞ্চলসহ নিচু এলাকার ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও এখনও তলিয়ে আছে শত শত হেক্টর জমির আমন খেত। দেশের উত্তরে অবস্থিত ভৌগোলিক অঞ্চল উত্তরবঙ্গ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ অনুন্নত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অঞ্চলের কিছু জেলার অবস্থা দারিদ্র্যসীমার বেশ নিচে। যে কারণে এ অঞ্চলকে মঙ্গা অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করা হয়। অঞ্চলটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের দারিদ্র্যের জন্য বেশকিছু কারণ দায়ী। এর অন্যতম হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব অঞ্চল প্রকৃতিগত কারণেই সৃষ্টিলগ্ন থেকে অন্যান্য অঞ্চল থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয় উত্তরবঙ্গের মানুষকে। তবে এও সত্য, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের পেছনে মানুষও কিছুটা হলেও দায়ী, যে কারণে দুর্যোগের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায়।
উত্তরবঙ্গের বেহালদশার জন্য মূলত দুটি প্রাকৃতিক কারণ দায়ী। তা হলোÑবন্যা ও নদীভাঙন। মানচিত্রের দিকে তাকালেই লক্ষ করা যায়, উত্তরবঙ্গের ওপর দিয়ে ২০০-এর বেশি নদী প্রবাহিত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকা অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে নদীর সংখ্যা ৪০৫, অর্থাৎ প্রায় অর্ধসংখ্যক নদী উত্তরবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো পদক্ষেপ। ফলে সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে এসব নদী তাদের গতিপথ পরিবর্তন করায় সৃষ্টি হচ্ছে ভাঙনের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ। প্রতি বছর ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে আশ্রয়হীন হচ্ছে হাজারো মানুষ। আবার নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণের অভাবে পলি জমে এর গভীরতা কমছে। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে নদীর স্রোত, হারিয়ে যাচ্ছে নদীর সজীবতা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।
বেসরকারি জরিপে দেখা যায়, সঠিক পদক্ষেপ আর পরিকল্পনার অভাবে উত্তরবঙ্গের প্রায় ৫৭টি নদী হারিয়ে যাওয়ার পথে। এমন অবস্থায় পানিপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ছে উপকূলে। শত শত গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে, সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ বন্যা। প্রতি বছর একবার, এমনকি দু-তিন বার পর্যন্ত বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে অঞ্চলটি। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ এর আশপাশের অঞ্চলে নদীভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি দিনদিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এমন অবস্থায় সরকারের উচিত বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নদীগুলোর সজীবতা ফিরে আনার জন্য নদী খনন, নদীশাসন ও পানির গতিপথ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া এ অঞ্চলের নদীভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। যেহেতু উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী তিস্তার উৎপত্তি ভারতে, তাই এর পানি নিয়ন্ত্রণ ভারতের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশের সৃষ্টিলগ্ন থেকেই দেখা যায়, ভারত এ নদীর পানি তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এর ফলে বাংলাদেশে অসময়ে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে হঠাৎ বন্যা, বৃদ্ধি পাচ্ছে নদীভাঙন। এভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। এমন অবস্থায় তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্সা নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, উত্তরাঞ্চলের বন্যার ভয়াবহ প্রকোপে যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো মহলেরই যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। অথচ অল্প কদিন আগেই দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে (কুমিল্লা ফেনী নোয়াখালী চট্টগ্রাম) বন্যার্তদের সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে যে উচ্ছ্বাস ও জাগরণ দেখা গিয়েছিল তা অভূতপূর্ব। উত্তরবঙ্গে সে ধরনের উদ্যোগ কিংবা মনোযোগের অভাব রয়েছে বলে ইতোমধ্যে একাধিক মহলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñকেন উত্তরবঙ্গের এ ভয়াবহ বিপর্যয় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক মনোযোগ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এ ক্ষেত্রে দায়ী। আমাদের দেশের প্রশাসনিক কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়নি। ফলে পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। আর বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় প্রান্তিক অঞ্চলগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট সমস্যা প্রায়ই অবহেলিত থেকে যায়। এমনটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অসম ব্যবস্থাপনা তৈরি করে। যেকোনো দুর্যোগের ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরের মনোভাব ও মূল্যবোধের পরিবর্তন জরুরি। দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু যে প্রশাসনিক দায়িত্ব, এমনটি ভাবলে ভুল হবে। কারণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষেরও সমান সহযোগিতা প্রয়োজন।
উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের একটি বৃহৎ অংশ। এ অঞ্চলকে পেছনে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সব অঞ্চলের সমান উন্নয়ন জরুরি। প্রতিটি অঞ্চলেরই অর্থনৈতিক অবদান রাখার অবকাশ রয়েছে। সামগ্রিক স্বার্থেই উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতির দিকে বাড়তি মনোযোগ জরুরি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলায় প্রায় ৫০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় জনগণ এবং কিছু ছোট ছোট সংগঠন নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে সহায়তা কার্যক্রম চালালেও এ ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুধু স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সমন্বিত ত্রাণকার্যক্রম ও পুনর্বাসন এখন অপরিহার্য। দুর্যোগের এ সময়ে আমাদের সবাইকে একত্র হয়ে কাজ করতে হবে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন জরুরি। যেহেতু উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের মূল বাধা বন্যা ও নদীভাঙন, তাই সরকারকে এগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে হবে। অন্যথায় এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাবে।
উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় বছরে দুবার বন্যা। তাই এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নকল্পে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। বন্যা ও নদীভাঙনে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে আর বসে থাকতে পারে না। তাদের অবশ্যই নদীর তীর সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি এসব প্রকল্প যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে যেন সবচেয়ে কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাদের বিশেষজ্ঞ ও এনজিওগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে। নদীভাঙন একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভাঙন রোধে এখনও কার্যকর উপায় বের করতে না পারায় প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এত বছর হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আমরা নদীভাঙনের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে পাইনি।
বন্যা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে টেকসই নদীশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের নিরিখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নিরিক্ষার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিবারগুলো নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া, অস্থায়ী আবাসনব্যবস্থা, ড্রেজিং করে নদীর স্বাভাবিক নাব্য ধরে রাখার কথা বহুজন বহুবছর ধরে বলেই যাচ্ছেন। কথা না বলে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, নদীভাঙন ঠেকানোর জন্য সব মহলের সদিচ্ছা থাকতে হবে। এ সদিচ্ছার অভাবেই অতীতে জন্ম হয়েছে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকট নিরসনে নজর গভীর করতে হবে।