আখাউড়া সীমান্ত
রুবেল আহমেদ, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১২:১৬ পিএম
আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:১৬ পিএম
আখাউড়া চেকপোস্ট। ছবি : সংগৃহীত
সীমান্তবর্তী উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অবৈধ পথে সীমান্ত পার হচ্ছে নানা বয়সি নারী-পুরুষ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সীমান্ত এলাকায় মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ছে কিছু লোক।
স্থলপথে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম আখাউড়া সীমান্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের ফলে অবৈধ সীমান্ত পারাপার দিন দিন বাড়ছে এ পথে। মূলত সীমান্ত পার হলেই ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহর। আর শহর থেকে খুব কাছেই বিমানবন্দর ও রেলস্টেশন। তা ছাড়া দেশের অন্যান্য সীমান্তের চেয়ে এ সীমান্ত অনেকটা নিরাপদ। তাই আখাউড়া সীমান্তপথে অবৈধ পারাপার বেড়েছে বলে জানায় স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা বলছে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ পথে সীমান্ত পার করার কাজ করছে একাধিক চক্র। এ চক্রের সদস্য হলেন আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের হীরাপুর মধ্যপাড়ার হেবজু ভূঁইয়ার ছেলে আল-আমীন ও বিজয়। তাদের সঙ্গে রয়েছেন মনিয়ন্দ ইউনিয়নের খারকোট গ্রামের সাত্তার মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া। অন্যদিকে দক্ষিণ ইউনিয়নের আবদুল্লাপুর গ্রামের কামাল মিয়ার ছেলে কিবরিয়া ও কালিকাপুর গ্রামের মৃত ফুল মিয়ার ছেলে হুমায়ুন মিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের হীরাপুর মধ্যপাড়া, ধলেশ্বর (কাওয়ালী মুড়া) ও কালিকাপুর সীমান্ত দিয়ে দিনে-রাতে স্থানীয় কিছু দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষ ও শিশু অবৈধ পথে ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত করে। মাথাপিছু ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে থাকে দালাল চক্রের সদস্যরা। ওই টাকা থেকে ভারতীয় দালাল নিয়ে থাকে জনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা, দালালের বাড়ি থেকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেওয়ার লেবার পেয়ে থাকে ৫০০ টাকা। প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার টাকা। এতে একজনকে ওপারে পাঠাতে খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। উপজেলার এ সীমান্তে সরাইল ব্যাটালিয়নের (২৫ বিজিবির) অধীনে ফকির মুড়া বিওপি ক্যাম্প রয়েছে।
হীরাপুর মধ্যপাড়ার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির, হাবিজ ভূঁইয়া, ইকবাল ভূঁইয়াসহ ধলেশ্বর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জন লোক সীমান্ত দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ পারাপার হয়। এ চক্রটা খুব ভয়ংকর। তাদের ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। এলাকার কেউ প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মাদক মামলা ও মারধরের শিকার হতে হয়। এ পথে মানব পাচার, মাদকদ্রব্য সবকিছুই চলে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। প্রশানের লোকজনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
আখাউড়া থানাসূত্রে জানা গেছে, আল-আমীনের নামে আখাউড়া থানায় ২২টি মাদক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে হুমায়ুন মিয়ার নামে রয়েছে ছয়টি মামলা। আর কিবরিয়ার নামে আখাউড়া থানায় আটটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় একটি এবং নরসিংদীর রায়পুরা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা রয়েছে।
অভিযুক্ত কিবরিয়া মুঠোফোনে অবৈধ পারাপারে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন। থানায় একাধিক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘মামলার বিষয়গুলো ভিন্ন’ বলে কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাদের বাড়িতে গেলেও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যরাও এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে আখাউড়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল হাসিম বলেন, ‘সীমান্তে দায়িত্ব পালন করে বিজিবি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিজিবির সঙ্গে আলোচনা করে মানব পারাপারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরাইল ব্যাটালিয়ন (২৫ বিজিবির) অধিনায়ক লে. কর্নেল ফারাহ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব বিষয় মাথায় রেখে ইতোমধ্যে বিওপিতে লোকবল বৃদ্ধি করেছি।’
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় প্রায় প্রতিদিন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ বাংলাদেশি নাগরিক আটকের খবর প্রকাশ হচ্ছে তাদের গণমাধ্যমে।