প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৬:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:৫০ পিএম
পদ্মা নদীর বাড়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিমাঞ্চল তলিয়ে গেছে। শুক্রবার শিবগঞ্জের বোগলাউড়ি থেকে তোলা। প্রবা ফটো
উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে রংপুরে তিস্তা নদীতে পানি বাড়ছে। শুক্রবার নদীটিতে ৯ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, দ্বীপ ও চরবাসী বন্যার আতঙ্কে রয়েছে। তা ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ সমস্যায় পড়েছে। ৬ ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। তাদের নেই বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবার। একই সঙ্গে গো-খাদ্য সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের জেলা প্রতিবেদক এই খবর পাঠিয়েছেন।
রংপুর বিভাগে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার কারণ সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মৌসুম সক্রিয় থাকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এ মৌসুমে জলীয় বাষ্প চট্টগ্রাম, বরিশাল ও রংপুরের ওপর দিয়ে ভারতের বিহারে গিয়ে মেঘমালা তৈরি করে। শনিবারেও রংপুর বিভাগে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হবে। তারপর বৃষ্টি কমবে এবং আগামী মাসের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হবে।
শুক্রবার সকালে তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বেলা ৩টায় বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচর এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এদিকে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা তিস্তা নদীর জেগে ওঠা চরে শীতকালীন আগাম শাক-সবজি চাষের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। নদীর পানি বৃদ্ধিতে তা ভেস্তে গেছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বন্যার কারণে আমার ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সেই সঙ্গে উজানে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, শুক্রবারের মত আজ শনিবারও রংপুর বিভাগের অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণেরও পূর্বাভাস রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ত্রিমুখী ভোগান্তিতে পানিবন্দি মানুষ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানিতে বন্দি নিম্নাঞ্চলের মানুষ। নেই বিশুদ্ধ পানি ও খাবার, নেই নৌকা। তা ছাড়া গো-খাদ্য সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এদিকে পানিতে বন্দি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
দুর্লভপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, বাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়ায় গৃহস্থালির কাজ করতেও ভোগান্তিতে পড়েছে নারীরা। উঁচু করে জায়গা বানিয়ে রান্নাবান্না করছেন তারা। অনেকের টিউবওয়েল ডুবে গেছে, দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম বলেন, পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি হওয়ায় নিম্নাঞ্চলে কিছু গ্রামের মানুষ পানি বন্দি হয়। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় শুকনা খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাগুরায় জলাবদ্ধতার তেমন উন্নতি হয়নি
জেলায় গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন দিনের একটানা বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অফিস। এ ছাড়া ভোগান্তির মধ্যে পড়ে শহরের সাধারণ মানুষ। বর্তমানে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও তেমন একটা উন্নত হয়নি।
শুক্রবার বৃষ্টি না হলেও জলাবদ্ধতার খুব একটা উন্নতি হয়নি। এখনও পর্যন্ত রয়েছে জলাবদ্ধতায়। তবে কিছু কিছু জায়গায় পানি কমতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পানি টান ধরায় অফিসে যাতায়াতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সেই সঙ্গে মাগুরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভেতরে পানি সরে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি হয়েছে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও পর্যন্ত পানি বেঁধে আছে। আবাসিক এলাকার চিত্র একই। বাস টার্মিনালে জলাবদ্ধতার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভা দল গঠন করে বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম চালিয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ আশা করছে আজকে রাত্রে বৃষ্টি না হলে আগামীকাল শনিবারে শহরের জলাবদ্ধতার উন্নতি হবে।
মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল বারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যেসব জায়গায় পানি আটকে আছে সেখানে আমাদের জনবল কাজ করছে। আমরা দল গঠন করে দিয়েছি। যেখানে পানি বেঁধে আছে সেই জায়গা চিহ্নিত করে কাজ করার জন্য। দিনব্যাপী সেই কাজটাই করা হয়েছে। আশা করছি আগামী কালকের মধ্যেই সব জায়গায় কিছুটা উন্নতি হবে।
দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে দুধকুমার নদের পানি সমতল স্থিতিশীল আছে এবং বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রংপুর বিভাগ ও তার কাছাকাছি উজানে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা রয়েছে এবং পরবর্তী দুই দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এর প্রেক্ষিতে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি সমতল আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, পরবর্তী এক দিন পর্যন্ত স্থিতিশীল এবং পরবর্তী এক দিন কমতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতল সতর্ক-সীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং জেলাগুলোর সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চল এবং কতিপয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। অপরদিকে আগামী তিন দিন পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি সমতল বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
তিনি বলেন, রংপুর বিভাগের অন্যান্য প্রধান নদীগুলো আপার করতোয়া, আপার আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ইছামতী-যমুনা ও যমুনেশ্বরী নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রংপুর বিভাগের এসব নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পরবর্তী এক দিন পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। পরবর্তী এক দিন নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে। বিভাগটির ব্রহ্মপুত্র নদ ও তার ভাটিতে যমুনা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে।
আজও রংপুরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ শনিবার রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায়, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিনের ও রাতের তাপমাত্রা ১-৩ ডিগ্রি বাড়তে পারে। শুক্রবার দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২২৮ মিলিমিটার। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রংপুর বিভাগে ৫৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে শুক্রবার ৯টা পর্যন্ত ৯১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে ১৩১ মিলিমিটার, দিনাজপুরে ১৯৭, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ১৮৩, ডিমলায় ১৪১, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১৭৪ ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৯৩ মিলিমিটার। শুক্রবার সারা দেশে এক হাজার ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকায় ১১৭, রাজশাহীতে ১৯৮, ময়মনসিংহে ২৪, সিলেটে ২, চট্টগ্রামে ২৩, খুলনায় ৮৭ ও বরিশালে ১৯ মিলিমিটার।