রাজশাহী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২২ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৩০ পিএম
পলিনেট হাউসে চাষাবাদ বাড়ছে বরেন্দ্র সবজি ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রাজশাহী অঞ্চলে। ছবি : প্রবা
রাজশাহীর কৃষিতে সাড়া ফেলেছে পলিনেট হাউস। রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম, সেচ ও সারের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, উৎপাদন বেশি হওয়াসহ এক মৌসুমের সবজি বা ফসল অন্য মৌসুমে চাষ সম্ভব হওয়ায় এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হচ্ছেন স্থানীয় কৃষক।
পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহীর কৃষকদের পলিনেট হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ পদ্ধতিতে নির্ধারিত পলিথিনের আচ্ছাদনে বা ঘরে চাষাবাদ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পলিনেট হাউস’।
রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগে দেশের সব বিভাগে অন্তত একটি করে পলিনেট হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। তা দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছেন স্থানীয় কৃষক। দেশের সবজিভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রাজশাহী বিভাগে এমন ২১টি পলিনেট হাউস তৈরি করা হয়েছে।
জলবায়ু মোকাবিলায় কৃষিবিজ্ঞানে পলিনেট হাউস টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার এক নতুন সম্ভাবনার নাম। এ প্রযুক্তিতে ভারী বৃষ্টিপাত, তীব্র দাবদাহ, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সব ধরনের নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
পবা ও বাঘা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পলিনেট হাউসে উচ্চমূল্যের ফসল সবজি যেমন ক্যাপসিকাম, ব্রুকলি, রকমেলন, রঙিন (হলুদ) তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি ও লেটুসের মতো সবজির পাশাপাশি যেকোনো ফসলের চারা উৎপাদনে দারুণ ফল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া এ পলিনেট হাউসে গ্রীষ্মকালেও শীতকালীন সবজি যেমন টমেটো, ফুলকপি, বেগুন, গাজর ইত্যাদিও উৎপাদন করা যাবে।

চাহিদা থাকায় অসময়ের সবজি বাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি করা যায়। এর ফলে সবজি চাষে যেমন বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি কৃষকও নতুন উৎসের সন্ধান পাবেন।
শুধু তাই নয়, পলিনেট হাউসে উন্নতমানের পলিথিনের আচ্ছাদন থাকায় সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে ফসলে বাইরের রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণও কম। ফলে কীটনাশকমুক্ত সবজি বা ফসল উৎপাদন সম্ভব এ পদ্ধতিতে। আচ্ছাদন থাকায় অতিবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ফসলের ক্ষতি হয় না। আর এ পদ্ধতিতে কৃষক সারা বছর সবজি চাষ করতে পারেন। তাই এ কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও উৎসাহ দিচ্ছে।
কৃষি বিভাগ থেকে পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকার শামসুল আলম কাদুর ২৫ শতক জমিতে সম্পূর্ণ সরকারি সহযোগিতায় পলিনেট হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। লোহার অ্যাঙ্গেলের ওপর উন্নতমানের পলিথিন দিয়ে তিনটি শেডে এ পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এ পলিনেট হাউসটির স্থায়িত্বকাল প্রায় ২০ বছর।
তবে পরে রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। প্রথমবারের মতো কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ খরচ দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য শামসুল আলমকে একটি শর্ত দিয়েছে কৃষি বিভাগ। টাকা পরিশোধের পরিবর্তে পলিনেট হাউস থেকে উৎপাদিত বীজ, শাকসবজি ও ফলমূল স্থানীয়দের কাছে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে হবে তাকে। যা স্থানীয় কৃষকদের এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করবে।
বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নে মো. আমিনুল ইসলাম রুমন নামে কৃষি উদ্যোক্তা লোহার পাইপ দিয়ে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। তাকে সার্বিক সহায়তা করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। তিনি তার হাউসে চাষ করছেন ক্যাপসিকাম।
পবার খড়খড়িতে অবস্থিত নার্সারির স্বত্বাধিকারী শামসুল আলম কাদু বলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ে এর ভেতরে চাষাবাদ শুরু করেছেন। শীতকালীন টমেটো, ফুলকপি, কাটা বেগুন, চায়না বেগুনের বীজসহ মোট ৮০ হাজার টাকার বীজ বপন করেছেন। আপাতত বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
পলিনেট হাউস ব্যবহারের দুই মাসের মধ্যেই উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন। তার সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েই খড়খড়ির অনেক কৃষক পলিনেট হাউসের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।
বাঘার আমিনুল ইসলাম রুমন জানান, ১ হাজার ৮ বর্গফুটের একটি পলি শেড তার, সৌরচালিত ড্রাগ অয়েল ও ডিপ ইরিগেশনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাতে। ফলে পলিনেট শেডে অসময়ে উৎপাদন করা হচ্ছে তরমুজ, টমেটো, রকমেলন, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, হরেকরকম ফুলসহ শীতকালীন নানা প্রকার বিষমুক্ত সবজি। পাশাপাশি তিনি সেখানে নানা জাতের চারাও উৎপাদন করছেন।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অসময়ে সবজি চাষের জন্য পলিনেট হাউস দেশে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি নতুনভাবে সংযোজন হতে যাচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদন যেমন সহজ হবে, তেমনি উৎপাদন বাড়বে। পলিনেটে সুস্থসবল চারা উৎপাদনের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন করে অধিক লাভবান হতে পারবেন সাধারণ কৃষক। রাজশাহী অঞ্চলে সবজি চাষে বৈচিত্র্য আসবে।’
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, ‘ইউরোপে ব্যবহৃত পদ্ধতি অনুযায়ী লোহার পাইপের খুঁটির ওপর ও চারদিকে ২০০ মাইক্রনের পলিথিন দিয়ে বানানো হয়েছে এ পলিনেট হাউস। আর তাতে সারা বছরই সবজি ও ফুলের চাষ হচ্ছে। অর্থাৎ ফুল ও সবজি চাষে শীত ও গরমের কোনো বাধাই থাকছে না এখানে। ফলে অসময়ে চাষিরা যেমন লাভের মুখ দেখবেন, তেমনি ক্রেতারাও সারা বছরই টাটকা সবজি ও ফুল পাবেন।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজদার হোসেন বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে পলিনেট হাউস পদ্ধতিতে চারদিকে প্লাস্টিকের ছাউনি থাকায় সূর্যের তাপ সরাসরি ক্ষেতে ঢুকতে পারে না। ফলে শীতের সবজি গরমেও চাষ করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে পানির অপচয় ঠেকানো যায়। সার দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে। প্লাস্টিকের চাদর থাকায় দুর্যোগের প্রকোপও অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।’
গবেষণায় দেখা গেছে, পলিনেট হাউসে ফসল উৎপাদন ২০ শতাংশ বেশি হয়। পাশাপাশি পোকামাকড়ের আক্রমণও ৭০ শতাংশ কম হয়। প্রাথমিকভাবে খরচ কিছুটা বেশি হলেও এতে উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম হবে।