মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৯:১৫ পিএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৯:৫২ পিএম
রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহ এলাকায় তিস্তা নদীতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। প্রবা ফটো
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহ। তিস্তা নদীতে
পানি কমে গেলেও ভাটির দিকে দ্রুত নামছে পানি। এতে করে ভাঙতে শুরু করে নদীর পাড়। চলতি
মাসে এ গ্রামের ৮৫টি ঘরবাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গ্রাম রক্ষা বাঁধের
কাছাকাছি চলে এসেছে নদী। ভাঙনের ফলে যেকোনো সময় এ বাঁধ বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে করে
লহ্মীটারী ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে চর শংকরদহ গ্রাম। বাঁধ ভেঙে গেলে মহিপুরের
শেখ হাসিনা সেতু, রংপুর- লালমনিরহাট কাকিনা সড়কও শঙ্কায় পড়তে পারে।
চর শংকরদহে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন ষাটোর্ধ্ব দুলালী বেগম।
স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এ বালুর বাঁধের পাড়ে তার বাড়ি। তিস্তা নদীভাঙন বিষয়ে
জানতে চাইলে বিরক্তি প্রকাশ করে দুলালী বেগম বলেন, ‘তোমরা সাংবাদিককে কয়া হামার কি
লাভ হয়। প্রত্যেকবার আইসেন, হামার কতা নিয়া টিভি-পেপারোত ছাড়ি দেন। তোমার টাকা কামাই
হয়, কিন্তু হামার বান্দ হয় কই। তিস্তা নদীর বান্দের কতা কইতে কইতে মুখের ব্যথা উঠি
গেইচে। ভোট আসলে সবায় কয় বান্দ করি দেমো। কিন্তু আইজ বান্দ হয় নাই। নদী বাড়ির গোড়োত
(কাছে) চলি আইসতোছে। কয়েকদিন পর এই বাড়ি তুলি নিয়া যাওয়া নাগবে। হামার কষ্টের কতা কয়া
কোনো লাভ হয় না। নয়া সরকার আসছে, ওমরা যদি কোনো কাম করে তাইলে চরোত থাকা যাইবে।
তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার চরের বাসিন্দা সাজু মিয়ার ঘর সাতবার ভেঙেছে।
সাজু মিয়া বলেন, শংকরদহে থ্যাকি এই পরিচয় দেওয়ার আর সুযোগ নাই। নদী একেবারে বান্দের
কাছোত চলি আসছে। যেইভাবে নদী ভাঙতোছে, এমন চলতে থাকলে দুই সপ্তাহের মধ্যে বাড়ি অন্যটে
নিয়া যাওয়া লাগবে।
তিনি বলেন, এইবার ধানের জমি নদী চলি গেইছে। গোটা বছর কী করি চলমো
সেই চিন্তাও আচে। কতবার কনু নদী কোনা বান্দি দেন। কায়ো কতা শুনে নাই। যখন মোর বাড়ি
চরের মাঝোত ছিল, নৌকাত করি বাড়ি ভাঙি আনছিনু। তখনও কইছি নদী বান্দেন। কই কিছু তো হইল
না। এলাকার চাঁন মিয়া, মধু, ভৈরব, মিঠু, সয়া ফারুক, টয়রা, তাজুদ্দিন সবারে বাড়ি নদীত
ভাঙি গেইচে। হামার এক সাতে বাড়ি ছিল। এ্যালা ওমরা কায়ো নাই, কারো সঙ্গে যোগাযোগও হয়
না। নয়া সরকার যদি হামার কতা শুনি যদি নদী কোনা বান্দি দেয়, তাইলে এই চরোত থাকবার পামো।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ তামান্না বলেন, তিস্তার
ভাঙনে ৮৫টি ঘরবাড়ি বিলীনের তথ্য আমার কাছে রয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত
করা হয়েছে।
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের উপদেষ্টা হাসেম আলী বলেন, আমরা দেখেছি তিস্তা
মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনা রাষ্ট্রদূত রংপুরে এসেছিলেন, ভারতও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে
আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে বলেও
হয়নি। নতুন সরকারের কাছে তিস্তা নদীবেষ্টিত উত্তরের ৫টি জেলার মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে।
এ সরকার দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চর শংকদহের মতো এমন শত শত চর, কৃষিজমি,
জীবন-জীবিকা রক্ষায় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান
নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মাহমুদুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা
বাস্তবায়নে আর্থিক প্রয়োজনীয়তা মেটাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স একটি মূল উৎস
হিসেবে কাজ করবে। এর জন্য ‘তিস্তা বন্ড’ চালু করতে হবে, যা প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক
ও এক্সপার্টদের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে। এ ছাড়া কূটনৈতিক ঝামেলামুক্ত
থাকতে প্রকল্পের কাজ দেশীয় প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিবিদ ও শ্রমিকদের দিয়ে করাতে হবে। এটি
হলে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নত হবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রংপুরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই সরকারের বিশেষ গুরুত্বের অংশ হিসেবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক। তিস্তা
ব্যারেজ তৈরি করে উত্তরাঞ্চলে খরার সময় মঙ্গা দূর করা হয়েছে, তেমনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা
প্রাণ-প্রকৃতিকে ঠিক রেখে বাস্তবায়ন করা হলে এখানকার জনগোষ্ঠী আত্মনির্ভরশীল হবে এবং
দেশের উন্নয়নকে চলমান রাখা সম্ভব হবে।