পুরাকীর্তি
শফিক সরকার, ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:২০ পিএম
আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:৪৯ পিএম
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় লজের প্রধান ফটক। প্রবা ফটো
ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন ময়মনসিংহের শশী লজ। ব্রহ্মপুত্র নদের অদূরে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্তের বাসভবন হিসেবে গড়ে তোলা শশী লজের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মূল ভবনের সামনে বাগানে স্থাপিত ফোয়ারার মাঝে গ্রিক দেবী ভেনাসের ভাস্কর্য। দামি মার্বেল পাথরে তৈরি এই ভাস্কর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসত এই শশীলজে। গত ৫ আগস্ট দুষ্কৃতকারীরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভাস্কর্যটি। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী ভাস্কর্য ভেঙে ফেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। একই স্থানে আগের আদলে ভাস্কর্য বানানোর দাবি জানান তারা।
নয়ানাভিরাম শশীলজের অবস্থান ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্র বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও এখনও রয়ে গেছে তাদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থাপনা। এসব স্থাপনা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। ৯ একর জমির ওপর নান্দনিক দ্বিতল ভবনটি নির্মাণ করেন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এ ভবনের নাম রাখা হয় শশী লজ। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে বাড়িটি বিধ্বস্ত হলে পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে নতুনভাবে ভবনটি নির্মাণ করেন তৎকালীন জমিদার শশীকান্ত আচার্য। ১৯১১ সালে শশীলজের সৌন্দর্যবর্ধনে তিনি সম্পন্ন করেন আরও কিছু সংস্কারকাজ। নবীন জমিদারের উদ্যোগে শশী লজ হয়ে ওঠে দারুণ দৃষ্টিনন্দন।
একটা সময় ভবনটি মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রয়েছে। ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত শশী লজটি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন এই বাড়িতে। দর্শণার্থীদের ঢুকতেই চোখে পড়ত শ্বেতপাথরের ফোয়ারার মাঝখানে গ্রিক দেবী ভেনাসের একটি ভাস্কর্য। সবার নজর কাড়ত সেই ভাস্কর্যটি। ব্রিটিশ শাসনামলের সে সময় এই নান্দনিক ভাস্কর্যটি ইতালি থেকে বানিয়ে এনেছিলেন শৌখিন রাজা। গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক শশীলজে প্রবেশ করে গ্রিক দেবী ভেনাসের ভাস্কর্যটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। ভেনাসের ভাস্কর্যহীন শশীলজকে নিঃসঙ্গ মনে হয়।
ইতিহাসের সাক্ষী শশীলজের গ্রিক দেবী ভেনাসের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহের সংস্কৃতিকর্মীরা। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একই স্থানে আগের আদলে ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান তারা।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী তাপস মজুমদার বলেন, শশীলজ মুক্তাগাছার জমিদারদের রেখে যাওয়া একটি ইতিহাস। জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী নিজ বাড়িতে দামি পাথরের গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য স্থাপন করেছিলেন। যুগ যুগ ধরে সীমানা প্রাচীরের ভিতরে ছিল এটি। এটি ভাঙার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যাদের ভালো লাগত না, তাদের সেখানে না গেলেই তো হতো। তাই বলে ইতিহাসের সাক্ষী এটা ভেঙে ফেলতে হবে। যারা ভেঙেছে তারা ভালো কাজ করেনি।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ঘটনার দিন আমি শশীলজের ভেতরেই ছিলাম। বেলা তিনটার দিকে একদল যুবক গেট ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই তারা ভেনাসের নান্দনিক ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে। ভাস্কর্যের অধিকাংশ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসককে জানিয়েছিলাম। এ ছাড়া এ ঘটনায় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, ময়মনসিংহের শশীলজ একটি ইতিহাস। সেখানে একটি নান্দনিক গ্রিক দেবি ভেনাসের ভাস্কর্য ছিল। শশীলজের সঙ্গে এই ভাস্কর্যটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। অনেক দামি পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছিল এটি। গত ৫ আগস্ট কিছুসংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল যুবক ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।