হুমায়ুন কবীর, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৪ ১৬:১৫ পিএম
বাবা-মাকে আম, কাঁঠাল ও চাল পৌঁছে দিয়ে বাইরে বের না হতে সতর্ক করে ফিরে এসে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মো. সোহেল মিয়া নামে এক মোবাইল টেকনিশিয়ান। সে ঢাকার রায়েরবাগ কদমতলী থানার দনিয়া এলাকার বাসিন্দা। গত ২০ জুলাই বিকালে এ ঘটনা ঘটে। তার জন্মস্থান ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নের অলহরী দুর্গাপুর গ্রামে জানাজা শেষে তাকে সমাহিত করা হয়।
পরিবারের দায়িত্বশীল উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বিপাকে পড়েছে সোহেলের পরিবার। বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি ভাইবোনদেরও দেখভাল করতেন সোহেল। শুক্রবার সোহেলের জন্মভিটা ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নের অলহরী দুর্গাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে সোহেলের মায়ের আহাজারি যেন থামছেই না।
ছেলের শোকে বিলাপ করতে করতে মা হাসনা আরা বেগম বলেন, ‘ছেলের দেওয়া আম, কাঁঠাল খাওনের আগেই ছেলের গুলি খাওয়ার খবর পাই। আমাকে এহন কেডা এভাবে আম, কাঁঠাল কিনে দিয়ে আসব। আমার সোহেলের তো কোনো অপরাধ ছিল না। তাইলে কেন তারে মারল? তার ছুডু বাচ্চাডারে কেডা দেখব, তার ভবিষ্যৎ কী? আমাদের সাজানো সংসারডা তছনছ অইয়া গেল।’
জানা যায়, দীর্ঘদিন আগে থেকেই গ্রামের বাড়িভিটা বিক্রি করে ঢাকা শহরমুখী হয়েছিলেন সোহেলের বাবা সুরুজ হাওলাদার। ভাড়া বাসায় থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করেছেন তিনি। পরিবারের ভরণপোষণ ও ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে ভাসমান কাঁচামালের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কর্ম করেছেন তিনি। এখন বয়সের ভারে আর কিছু করতে পারেন না। বড় ছেলে সোহেলই তাদের স্বামী-স্ত্রীর যাবতীয় খরচ বহন করত। ছোট ছেলে জুয়েল বড় ভাইয়ের দোকানে থেকে সহযোগিতা ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ শিখছিলেন।
বড় ছেলে সোহেল এরই মধ্যে ওই এলাকায় ভালো মানের মোবাইল টেকনিশিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ঢাকার শনির আখড়া আরএস টাওয়ার মার্কেটে সোহেল টেলিকম নামে তার একটি দোকান রয়েছে। সোহেলের হযরত বিল্লাল নামে সাড়ে তিন বছরের এক ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী আয়েশা পাগলপ্রায়।
সোহেলের বাবা সুরুজ হাওলাদার ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মার্কেট বন্ধ। সবাই ডরেভয়ে রয়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী ছেলের বাসা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে মিরাজ নগরে বাসা নিয়ে থাকি। বাসা ভাড়াসহ আমাদের যাবতীয় খরচ সোহেলই বহন করে। ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘণ্টাদেড়েক আগে ২৫ কেজির এক বস্তা চাল, আম ও কাঁঠাল কিনে বাসায় দিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় বলছে, আব্বা চতুর্দিকে গ্যাঞ্জাম, বাইরে বের অইয়েন না, বাসায়ই থাইকেন। কিছু লাগলে আমাকে কইয়েন। তখন তার মা আবার কইল, বাবা সোহেল, আম আনছ, দুধ আছে ঘরে, বিকালে আইয়া পয়রো। আম দিয়া দুধ দিয়া খাইবা। অথচ আমাকে সতর্ক করে যাওয়ার ঘণ্টাদেড়েক পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে তারই গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাই। তার দেওয়া আম, কাঁঠাল এখন ঘরে পচতেছে। ওর পেটে গুলি লেগে তা বের হয়ে দোকানে থাকা ফ্রিজে লেগেছে।’