খাগড়াছড়িতে শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতি
খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ২২:৪৩ পিএম
আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৪ ২২:৪৫ পিএম
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে পাওয়া গেছে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ। সরকারি বিধি ও আইন অমান্য করে জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে চার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক বরাবর। যার প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জানা যায়, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়াদুদ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পরে ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়। ২০২২ সালের ৫ জুলাই বিদ্যালয়টি এমপিও তালিকাভুক্ত হয়।
২০১৭ সাল থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএ। এনটিআরসিএ যাতে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারে, সেজন্য জালিয়াতির মাধ্যমে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৪ সালের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চার শিক্ষকের নিয়োগ দেখিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্র অনুযায়ী, বিদ্যালয় এমপিও তালিকাভুক্তির আগেই কর্মরত শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে পরিপত্র মানা হয়নি। বরং অবৈধ নিয়োগ বৈধ করতে একটি জাতীয় দৈনিকে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপন তৈরির অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুসের বিরুদ্ধে।
জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সময় থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্ত ননÑ এমন সাতজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারজন শিক্ষক অন্য এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং বেতন ও বোনাস ভোগ করেছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জালিয়াতি ও অনিয়মের সব নথিপত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়, জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একজন আব্দুল মালেক। তিনি ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট রাঙামাটির লংগদু উপজেলার রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্ত তাকে ভুয়া নিয়োগপত্রের মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট তারিখে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। অথচ মাসিক পে অর্ডার (এমপিও) তালিকায় দেখা যায়, তিনি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে বেতন উত্তোলন করেছেন। এ ছাড়া জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলন করেছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত। তিনি নিজের ইনডেক্স নাম্বার পরিবর্তনের জন্য কৌশলে জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বারও বদলে ফেলেছেন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় এমপিওকরণের জন্য বিভিন্ন সময় প্রধান শিক্ষককে নগদ অর্থ দিয়েছি।’
জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া আরেক শিক্ষক সঞ্চায়ন চাকমা। ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মহালছড়ি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। মাসিক পে-অর্ডার (এমপিও) তালিকায় দেখা যায়, তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহালছড়ি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে বেতন উত্তোলন করেছেন। তাকেও ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেখানো হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই সঞ্চায়ন চাকমা ১৭ মাসে ৫ লাখ টাকার বেশি বেতন উত্তোলন করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সঞ্চায়ন চাকমা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক অনুমতি দিয়েছেন বলেই আমি বেতন উত্তোলন করেছি। উনি অনুমতি না দিলে সম্ভব ছিল না।’
অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত আরেক শিক্ষক হেলাল উদ্দিন ২০০৩ সালের ২২ অক্টোবর দীঘিনালার দাখিল মাদ্রাসায় যোগ দেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি সেই মাদ্রাসা থেকে বেতন উত্তোলন করেছেন। অথচ সেই হেলাল উদ্দিনকেও ২০০৪ সালের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। নিজের ইনডেক্স নাম্বার পরিবর্তনের জন্য তিনিও জাতীয় পরিচয়পত্রের কয়েকটি নাম্বার পরিবর্তন করেছেন। তিনিও ২০২২ সালে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাস দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলন করেছেন। অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাকে কীভাবে নিয়োগ দিয়েছে আপনি সেটা প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করেন। তিনিই বলতে পারবেন।’
দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. ইব্রাহিম (রবি) গুইমারা উপজেলার শহীদ লে. মুশফিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ তাকে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারির ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে কোনো গ্রন্থাগারিক পদ না থাকলেও মো. হযরত আলী নামে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মিজানুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন ও ছাদিকুন নাহার বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির আগে বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন না।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ইউনুস প্রথমে দাবি করেন, তিনি বিধি মোতাবেক নিয়োগ দিয়েছেন। অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের পুরোনো তারিখে (ব্যাক ডেটে) নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তড়িঘড়ি করে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন দেওয়ার পরও তিনি রিসিভ করেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান জানান, বিষয়টি শুনেছি। ইতোমধ্যে তদন্তের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।