প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ১১:২০ এএম
ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে আবারও নদীর পানি বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের তাহিরপুর বাদাঘাট সড়ক এভাবেই পানিতে তলিয়েছে। প্রবা ফটো
দেশের উত্তরাঞ্চলের চার নদী তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ঘাঘটের পানি বৃদ্ধির কারণে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের আভাসও দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে কুড়িগ্রামে টানা ১১ দিন ধরে বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে চর ও নিম্নাঞ্চলের সব এলাকা। গত বুধবার দুপুরের পর থেকে আবারও নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পানির স্রোতে ধরলা সেতুর পূর্ব দিকে ৩০ মিটার সংযোগ সড়কের প্রস্থে ৫ ফিট এবং দৈর্ঘ্যে ১৫ মিটার ধসে গেছে। জেলার ৯ উপজেলার ৫৫ ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ গত ১০ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে কষ্টে দিন পার করছে। বন্যাদুর্গত অঞ্চলের প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ঘাঘট নদের পানি গাইবান্ধা পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে। ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বেড়ে কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। পদ্মা নদীর পানিও বাড়ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
গাইবান্ধায় বাড়ছে পানি, ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা
গাইবান্ধা প্রতিবেদক জানান, গাইবান্ধার নদ-নদীতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। জেলা পাউবো কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রাহ্মপুত্রের পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সাঘাটায় যমুনার পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। শহরের নিউ ব্রিজ স্টেশনে ঘাঘট নদের পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও গত ২৪ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া তিস্তার পানি ও করতোয়ার পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দফা বন্যায় দীর্ঘদিন পানিতে তলিয়ে থাকায় জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের খেত নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষকরা।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খোরশেদ আলম জানান, বন্যায় জেলার ৬ হাজার ৪৩৬ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯৭৩ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হতে পারে। এতে ৬৬ হাজার ৮৬৯ জন কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৃষকের ৭৬ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক জানান, প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বন্যায় ধুঁকছে কুড়িগ্রামের হাজারো পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ। এর মধ্যে নতুন করে ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে পানি বাড়তে শুরু করায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গতকাল দুপুর ১২টায় পাওয়া প্রতিবেদনে পাউবো নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিন নদীর পানি পাঁচ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নাগেশ্বরীর নুনখাওয়া, উলিপুরের হাতিয়া এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ভুরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার এবং কুড়িগ্রাম শহরের সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টা থেকে এসব নদ-নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামের ধরলা অববাহিকায় ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা উত্তরাঞ্চলের উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এ সময় ধরলা ও দুধকুমার নদের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য বলছে, চলমান বন্যায় জেলার ৯ উপজেলার ৫৫ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভার ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্লাবিত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দাবি, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক।
রংপুরে তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে
রংপুর অফিস জানায়, উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরে বৃদ্ধি পাওয়া তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। গতকাল তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে দিনভর ২০ সেন্টিমিটার পানি কমেছে। এতে করে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরের প্লাবিত কিছু এলাকা থেকে পানি সরে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ৬টায় কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। সন্ধ্যা ৬টায় এ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এদিকে তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে সন্ধ্যা ৬টায় পানি বিপদসীমার ৭৯ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল ও এর উজানে ভারতে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে করে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ঘাঘট নদের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কে যান চলাচল বন্ধ
সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক জানান, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে আবারও নদীর পানি বাড়ছে। গতকাল সন্ধ্যায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে তাহিরপুর সুনামগঞ্জ সড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২৬০ ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৩১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়েছে। উজানে ও জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে গতকাল দুপুর ১২টায় ৩৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
পানি বাড়ায় তাহিরপুর সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ারখলা অংশ মৌসুমের তৃতীয়বারের মতো পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীদের এই অংশে ফেরি নৌকা করে পার হতে হচ্ছে। এই সড়কের আনোয়ারপুর অংশেও পানি উঠেছে।