× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সিলেটে বন্যা, কতটা দায়ী হাওরের সড়ক

গোলাম আনোয়ার সম্রাট ও মাহমুদা বীথি

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৪ ১৭:২৫ পিএম

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৪ ২২:৪৫ পিএম

ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক। ফাইল ফটো

ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক। ফাইল ফটো

দুই পাশে থইথই পানি। আকাশজুড়ে মেঘের ভেলা। যতদূর চোখ যায় শুধুই জলরাশি। আকাশ যেন মিশে আছে জলরাশিতে। দেশের পূর্ব-উত্তরাঞ্চল কিশোরগঞ্জে চোখে পড়বে এই উপভোগ্য অপরূপ দৃশ্য। জেলায় হাওরের বুক চিরে চলে যাওয়া সড়ক থেকেই এমন দৃশ্য উপভোগের স্বাদ মেলে। যে সড়কটি নির্মিত হয়েছে চার বছর আগে। জেলার তিনটি উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে সংযুক্ত করেছে এই অলওয়েদার সড়ক। চালু হওয়ার পর থেকে কিছু মহলে সমালোচনা ছিল- এটি পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি করবে। সেই সমালোচনা গত চার বছরে ঠেকেছে- হাওরাঞ্চলে বন্যার কারণও অলওয়েদার সড়ক। বলা হচ্ছে, হাওরবেষ্টিত সিলেট-সুনামগঞ্জে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তীব্র বন্যার কবলে পড়ার পেছনে এই সড়ক দায়ী।

সিলেট-সুনামগঞ্জবাসীর অভিমত- অতীতে বহুবার তারা বন্যার কবলে পড়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো মারাত্মক অবস্থা দেখেননি। দুই বছর আগে দুই জেলায় দেখা দেয় শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা। এবার বর্ষায়ও বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে। বর্তমান অবস্থা এমনÑ দিনভর ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা। মৌসুম শুরু হতে না হতেই বানের পানিতে ডুবছে সিলেট-সুনামগঞ্জ। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, অনবরত বৃষ্টির পাশাপাশি তীব্র বন্যার কারণ হিসেবে অলওয়েদার সড়ককে দায়ী করছেন অনেকে।

এমন প্রেক্ষাপট রাজনীতিকদেরও আলোচনার কেন্দ্রে ঠাঁই করে নিয়েছে। বিষয়টিকে ‘পলিটিক্যাল টুল’ (রাজনৈতিক হাতিয়ার) হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপি। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের এক শীর্ষ নেতা। জনতার মত থেকে রাজপথের ‘রেটোরিক’- সবখানে যখন আলোচনা, তখন বিষয়টি নিয়ে জানার চেষ্টা করেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

তার আগে অবশ্য জেনে নেওয়া উচিত হাওরের বুক চিরে কেন এই যোগাযোগ ব্যবস্থা?

কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৫৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দেশের হাওরাঞ্চল; যা চ্যাপ্টা বেসিন, দূরচিত্রে দেখতে বাটির মতো। দেশের বৈচিত্র্যময় এই অঞ্চলের সিংহভাগ বছরের ছয় মাসের বেশি সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে। পানি নেমে গেলে শ্রীহীন ভূমিতে হাওরবাসী চাষাবাদ করেন।

স্বাধীনতার পর হাওরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিশেষ উদ্যোগ নেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা খুব একটা সুফল বয়ে আনেনি। পরে ১৯৭৭ সালে কিশোরগঞ্জে বোর্ডের সদর দপ্তর স্থাপন করে অনেক উন্নয়ন সম্পাদন করা হয়। কিন্তু সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে সবকিছু বন্ধ করে দেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালে হাওর ও জলাশয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে। এর আওতাভুক্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশ বছর মেয়াদি ১৭টি এরিয়ায় ১৫৩টি প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৭ হাজার ৯৬৩ কোটি ৫ লাখ টাকা; যা পাঁচ, দশ ও বিশ বছর (২০১২-২০৩২) মেয়াদি এসব প্রকল্প তিন ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভিশন ২০২১’ বাস্তবায়নে এটি একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা- হাওর উন্নয়নের রোডম্যাপ। এতে সম্ভাব্য সব মূল বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ মহাপরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সব মন্ত্রণালয়কে প্রকল্প গ্রহণের সময় হাওর মহাপরিকল্পনা অনুসরণ করার আহ্বান জানান। হাওর এলাকায় যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের আগে মহাপরিকল্পনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। খাদ্য উৎপাদন ও মৎস্য উন্নয়নের জন্য দেশের হাওর ও জলাভূমি রক্ষা এবং নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন খাল ও নদী যথাযথভাবে পুনঃখনন করতে হবে।

হাওরের বুক চিরে অলওয়েদার সড়ক

কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করতে ‘ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক প্রকল্প’ হাতে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখে ২০২০ সালে। ৮৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি ওই বছরের অক্টোবরে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উদ্বোধনের পর থেকে ২৯.৭৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ এই অলওয়েদার সড়কটি দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে অনেকে এই সড়ক দেখতে ছুটে আসেন। তবে ২০২২ সালে সিলেটে বন্যার পর নতুন আলোচনায় উঠে আসে এই সড়ক। তখন মন্ত্রিসভায়ও আলোচনা হয়েছে এই সড়ক নিয়ে। হাওরের বন্যায় এই সড়কের প্রভাব রয়েছে কি নাÑ তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।

রাজনীতিতে যখন ‘রেটরিক’

এবারের বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর পেছনে কিশোরগঞ্জের অলওয়েদার সড়ককে সরাসরি দায়ী করেছে বিএনপি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত দাবি করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সিলেটের হাওর উন্নয়নের নামে চলছে অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। নদীতে বাঁধ দিয়ে স্বাভাবিক গতি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার কারণেই বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই অঞ্চলে প্রতিবছর বন্যা হওয়ার পরও ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি সরকার। মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যে সরকারের কর্মসূচি, সে সরকারের দ্বারা একটি জাতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি লাভ কখনই সম্ভব নয়।

বন্যা উপদ্রুত মানুষকে সরকারের ভুল নীতির খেসারত দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যেন বন্যা ও ধ্বংস সমার্থক হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল ও মেঘ-ভাঙা বৃষ্টিপাতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে বন্যা ধ্বংসের তাণ্ডব চালাচ্ছে। বহু মানুষের বসতবাড়ি, ক্ষেত-খামার প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-কাচারি, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ ও ক্ষেতের ফসল। সিলেটে জলধারা বর্ষণে মনে হয় যেন পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে।

হাওরবাসীর প্রতিবাদ ও দাবির যৌক্তিকতা

সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে অলওয়েদার সড়ককে দায়ী করার প্রতিবাদ জানিয়েছেন হাওরবাসী। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে আয়োজিত এক মানববন্ধনে তারা বলেছেন, হাওর মানে বিচ্ছিন্ন জনপদ। সড়ক না থাকায় বর্ষায় নৌকা ও গ্রীষ্মে পা ছাড়া যাতায়াতের বিকল্প কোনো অবস্থা ছিল না। হাওরে মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও লোকসমাজে তা দৃশ্যমান হতো না। উপজেলার এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত। জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা রীতিমতো বিস্ময় ছিল। শত বছরের দুর্ভোগ লাঘব করেছে এই অলওয়েদার সড়ক। সড়কটি হওয়ার পর হাওরবাসীর যাতায়াতের দুর্ভোগ অনেকটা কমে গেছে।

হাওরবাসী বলেন, হাওরের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। হাওরের অবহেলিত জনপদের মানুষের এই ভালো সহ্য হচ্ছে না দেশের একশ্রেণির মানুষের। তারা সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যার দায় চাপাচ্ছে সড়কটির ওপর। শুধু তা-ই নয়, সড়কটিকে দায়ী করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যার সঙ্গে সড়কটির কোনো যোগসূত্র নেই। কারণ, এখনও সড়কের দুই পাশের পানি সমান। যদি সড়কের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতো, তাহলে এক পাশে পানি বেশি থাকত, অন্য পাশে কম। এই অপপ্রচার অজ্ঞতা ও পরশ্রীকাতরতা ছাড়া কিছুই নয়। কর্মসূচি থেকে বক্তারা অলওয়েদার সড়ক নিয়ে অপপ্রচার বন্ধের আহ্বান জানান।

২০২২ সালে সিলেটের বন্যার পর হাওরের এই সড়কের প্রভাব রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেটির নেতৃত্বে ছিলেন পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তার মতে, হাওরে বন্যার পেছনে অলওয়েদার সড়কের ওপর সরাসরি দায় চাপিয়ে দেওয়া সঠিক নয়। সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বন্যার সঙ্গে এই সড়কের আদতে কোনো সম্পর্কই নেই। তবে সড়কটির কারণে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে- এই দাবির যথার্থতা রয়েছে; যা প্রকৃতিবিরুদ্ধ।

ড. আইনুন নিশাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইটনা-মিঠামইন সড়ক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলেও সিলেট-সুনামগঞ্জ বন্যায় এই সড়কের দায় নেই। সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের সড়ক অনেক ভাটিতে। তাই এই সড়কের সঙ্গে সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই।

বন্যায় সড়কের ভূমিকা না থাকলেও হাওরের পরিবেশে ক্ষতিতে এই সড়কের দায় আছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, হাওরের মধ্যে এভাবে সড়ক নির্মাণ প্রকৃতিবিরুদ্ধ; যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি ১৯৯৭ সালের রেগুলেশন, সংশোধিত ২০১২ সালের (১) অনুযায়ী বিরোধী। হাওরকে হাওরের মতো থাকতে দিতে হবে। সড়ক হবে ব্রিজের মতো; যার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। এই ধরনের সড়ক নির্মাণের ক্ষতিকর প্রভাব তো রয়েছেই। ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে বলেও জানান এই পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা