সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ০৮:৫৪ এএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪ ১১:০৭ এএম
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লা ওরফে মোল্লা সুমন। ছবি : সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লা ওরফে মোল্লা সুমনের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। তাই বলে আয়-রোজগারও কিছু কম নেই তার। মাত্র চার বছরে তিনি এমন অর্থবিত্তের মালিক বনে গেছেন যে তার গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। কী এমন জাদু জানেন মোল্লা সুমন! নাকি পেয়েছেন আলাদিনের চেরাগ! বাস্তবে মোল্লা সুমনের আয়ের উৎস কারও অজানা নয়। চিনি চোরাচালান থেকেই মাসে মাসে আসে কোটি কোটি টাকা। ‘ফাও’ হিসেবে চাঁদাবাজির বাড়তি আয় তো আছেই। ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েই তিনি একরামপুর সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড নিজের কবজায় নিয়ে চাঁদাবাজি করে কোটি টাকা কামিয়েছেন। তাছাড়া বিভিন্ন উপজেলা কমিটি গঠন করে অনুমোদন দেওয়ার বিনিময়েও পকেটে পুরেছেন মোটা অঙ্কের টাকা। সেই হিসাবে ছাত্রলীগ নেতা মোল্লা সুমনেরও একটা পেশা আছেÑ তা হচ্ছে, চোরাকারবার আর চাঁদাবাজি।
ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পাওয়া ‘গোল্লায়’ যাওয়া মোল্লা সুমনের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগের শেষ নেই। জানা যায়, চোরাচালান ও অটো স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে তার প্রধান সেনাপতি ছিলেন ভাগ্নে নাজমুল ইসলাম হীরা। যিনি নিজেও একসময় ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন। সুমন-হীরা জুটির সঙ্গে তাদের অনুসারীরাও এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন।
সরেজমিন একরামপুর সিএনজি স্ট্যান্ডে গিয়ে জানা যায়, মোল্লা সুমন ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভাগ্নে হীরা ও অনুসারীরা শহরের সিএনজি অটোরিকশার প্রধান স্ট্যান্ডসহ সব স্ট্যান্ড দখল করে নিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। সুমনের পক্ষে কার্যত হীরাই সবকিছু দেখভাল করেন। হীরার বাড়ি নেত্রকোণার মদন উপজেলার ফেকনী গ্রামে হলেও শৈশব থেকেই তার বেড়ে ওঠা মামার বাড়িতে। তার বিরুদ্ধে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়সহ একাধিক মামলা রয়েছে।
সিএনজি চালিত অটোরিকশার মালিক, চালক, যাত্রী ও এলাকাবাসী জানায়, সিএনজি অটো স্ট্যান্ডের জায়গা মালিকপক্ষ ও স্থানীয় কাউন্সিলরদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া নিয়েছেন হীরা। কিন্তু সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছেন মোল্লা সুমন। একেক দিন একেকজনকে সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ করে অটোরিকশা থেকে প্রতি ট্রিপে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ২০০ সিএনজি ও অটোরিকশা পুরান থানা ও একরামপুর থেকে চামটাঘাট ও বালিখলায় যায়। একরামপুর থেকে কিছু অটোরিকশা ভৈরব এবং গাজীপুরেও যায়। সে হিসাবে দিনে ২০০ অটোরিকশা ও সিএনজি চলাচল করে। প্রতিদিন এই খাত থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়।
ছাত্রলীগের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান নয়ন জানান, এমন কোনো দপ্তর নেই যেখানে জেলা ছাত্রলীগের নামে চাঁদাবাজি হয় না। স্ট্যান্ডগুলোতে ছাত্রলীগের সভাপতি ও তার অনুসারীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তাদের হুমকি-ধমকির মুখে কেউ প্রতিবাদ করতেও সাহস করে না। কিশোরগঞ্জ থেকে চামড়াঘাট ও বালিখলা যেতে ৫০-৬০ টাকা ভাড়া ছিল। কিন্তু চাঁদাবাজির কারণে ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকা। অটোরিকশাচালক আমিরুল ইসলাম, হাবিবুল, রশীদ মিয়ার অভিযোগ, তারা যা আয় করেন তার বেশিরভাগই চলে যায় চাঁদা দিতে গিয়ে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা সুমন মোল্লা একরামপুর রেললাইন সংলগ্ন গাজী মার্কেটের দুটি বড় দোকানঘর দখল করে সেখানে ব্যক্তিগত অফিস খুলে বসেছেন। এখানে বসেই তিনি নানা অপকর্মের ছক কষেন। মার্কেটের মালিক গাজী আবদুল হক জানান, জোর করে তার মার্কেটের দোকান দখল করে নিয়েছেন সুমন। এ পর্যন্ত এক টাকাও তাকে ভাড়া দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া মোল্লা সুমন তাড়াইল, পাকুন্দিয়া, ভৈরব ও অষ্টগ্রামের আংশিক কমিটি অনুমোদন দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাওন আহমেদ নিলয়। তিনি বলেন, সুমনের অপকর্ম সম্পর্কে শুধু ছাত্রলীগ নয়, নির্বাচিত সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিদের সবাই জানেন। তারপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি মোল্লা সুমনের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের ঘটনা গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। সুমনের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তারা মনে করেন। একই সঙ্গে এর একটি বিহিত হওয়া দরকার বলেও মনে করেন তারা।
সুমন মোল্লার যত সম্পদ
আনোয়ার হোসেন মোল্লা সুমনের বাড়ি সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নে হলেও বর্তমানে থাকেন শহরের বয়লা এলাকায়। চার বছর আগেও অর্থকষ্টে ভুগতেন সুমন। জেলা ছাত্রলীগের পদ পাওয়ার পর থেকেই সেই অর্থকষ্ট দূর হওয়ার পর হয়ে ওঠেন প্রাচুর্যে ভরপুর। জীবনযাপনেও আসে চোখ ধাঁধানো জৌলুস। বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক মোল্লা সুমন। এ যেন গলি থেকে রাজপথে উঠে আসার কোনো রূপকথার গল্প।
প্রথমবারের মতো জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নাম ওঠার পরপরই জমি কেনাসহ প্রায় দুই কোটি টাকার মূল্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণে হাত দেন মোল্লা সুমন। সভাপতি হওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সম্প্রতি সেই বাড়ির কাজও শেষ করেছেন। এ ছাড়া সদর উপজেলার বয়লা, বৌলাই, নাকভাঙ্গা এলাকায় কোটি টাকার জমি, ৩৪ লাখ টাকা দামের একটি প্রাইভেট কার, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট থাকার কথা জানিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান নয়ন। তবে গাড়িটি কখনও শহরে আনেন না। কয়েক মাস আগে সুমনের দুই লাখ টাকা দামের মোবাইল ফোন সেট কেনার কথা জানা গেছে। ছাত্রলীগ নেতা হলেও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সংগঠনের কোনো নেতাকর্মী সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে লুৎফুর রহমান নয়ন বলেন, সুমন সম্ভবত এসএসসি পাস। কোনো কলেজের যেতে দেখা যায়নি তাকে। নিজেকে অবিবাহিত দাবি করলেও বাস্তবে সুমন বিবাহিত। তার স্ত্রীর নাম তারানা তাবাসসুম সুইটি। তাকে বেশিরভাগ সময় ঢাকায় রাখেন।
চোরাচালান ও চাঁদাবাজির টাকা ওড়ানোর ক্ষেত্রেও জুড়ি নেই সুমনের। সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশ। ঈদে বা অন্যান্য উৎসবে দুই হাতে নেতাকর্মীদের নানা উপহার বিলিয়ে থাকেন। তিনি বর্তমানে অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করেন বলে ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন সুমন মোল্লা তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রয়েছে। তারাই তিলকে তাল করছে। তিনি সভাপতি হওয়ার পর জাতীয় নির্বাচনসহ নানা নির্বাচনে ছাত্রলীগ বলিষ্ঠ ও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। প্রতিপক্ষরা তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি ম ম জুয়েল বলেন, ছাত্র নেতারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। তাদের বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতি, চাঁদাবাজির অভিযোগ শুনলে একজন নাগরিক হিসেবে হতাশ হই। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে আগামীর ছাত্র রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। মূল দলকে এ ব্যাপারে ভাবতে হবে।
কিশোরগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মী মো. সাদেকুজ্জামান নয়ন বলেন, হতবাক হয়ে যাই ছাত্রনেতাদের চাঁদাবাজি ও চোরাচালোনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা দেখে। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনোয়ার হোসেন মোল্লা সুমনকে সভাপতি, ফয়েজ ওমান খানকে সাধারণ সম্পাদক ও লুৎফর রহমান নয়নকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে তিন সদস্যের কমিটি অনুমোদন দেন। সেই কমিটি পার করেছে চারটি বছর। যদিও শুরু থেকেই এই কমিটিকে মানতে নারাজ ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ।
মোল্লা সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম পান্ত সাংবাদিকদের জানান, এসব বিষয় তাদের জানা নেই। তবে এ নিয়ে তদন্ত করা হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।