প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৪ ১২:১৩ পিএম
কেরু অ্যান্ড কোং বিডি লিমিটেডে। ছবি : সংগৃহীত
শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোং বিডি লিমিটেডে। দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনি ও একমাত্র ডিসটিলারি (মদ) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত কেরুতে গত মে মাসে এক দিনে ১০৪ জনকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র ৭২ ঘণ্টায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়ে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই নিয়োগ স্থগিত করে বিএসএফআইসির দেওয়া আদেশের পরও মৌসুমি শ্রমিক স্থায়ীকরণের নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ মে শুরু করে ১৫ মে পর্যন্ত মাত্র তিন দিনের মধ্যে সুপারসনিক গতিতে ১০৪ জন মৌসুমি শ্রমিক-কর্মচারীর স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে কেরু কর্তৃপক্ষ। অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তা স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় করপোরেশন থেকে। কিন্তু কেরু কর্তৃপক্ষ আমলেই নেয়নি নির্দেশের সেই চিঠি। নির্দেশ অমান্য করায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশারফ হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেওয়া হয়েছে বিএসএফআইসি থেকে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য। ভুক্তভোগী অনেকেরই অভিযোগ, যোগ্যতার বিচারে নয় বরং অর্থের বিনিময়ে ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অধিকাংশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি নিয়োগ দেওয়ার নাম করে ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের কাছ থেকে।
বিএসএফআইসি ও কেরুর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী লোকবলের সংকট থাকায় গত ১৪ মার্চ লোকবল চেয়ে নীতিমালা প্রস্তুত করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর সদর দপ্তর ২৫ মার্চ শূন্যপদ পূরণে নিয়োগের আহ্বান জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করে ২ এপ্রিল স্থায়ীকরণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে কোনো পত্রিকায় প্রকাশ না করে শুধু নোটিস বোর্ডে দেওয়া হয়। পরে ১৩ ও ১৪ তারিখ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় অংশ নেন ১৪০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। তার মধ্যে ৩৬ জন শ্রমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়। গত ১৫ মে বেলা ১১টার দিকে ১০৪ জনকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে এক যুগ পর ১০৪ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে মৌসুমি থেকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। ১৫ মে দুপুরের দিকে কেরুসহ সব চিনিকলে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করার নির্দেশ দেন বিএসএফআইসি সচিব চৌধুরী রুহুল আমিন কায়ছার। এ নির্দেশের পর সব চিনিকল জনবল নিয়োগ বন্ধ রাখলেও ১৫ মে তারিখে কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত নিয়োগের চিঠি কেরুর শ্রমিক ও কর্মচারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তড়িঘড়ি করে নিয়োগ সেরে চাকরির নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ওই তারিখেই নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান করানো হয়।
এদিকে স্থায়ীকরণে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না মানায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছেন কারখানার মৌসুমি ফিল্টার হেল্পার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাবুল আকতার নামে এক শ্রমিক।
অন্যদিকে বিএসএফআইসির পক্ষ থেকে ১৭ মে কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। করপোরেশনের দুটি চিঠির কপিই প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে রয়েছে। বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলমের পক্ষ থেকে দেওয়া কারণ দর্শানোর চিঠিতে বলা হয়, আপনার (ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেরু) বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, আপনি ১৩ মে ও ১৪ মে তারিখে মিলের মৌসুমি জনগণ থেকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষে ১০৪ জনকে ১৫ মে তারিখে নিয়োগপত্র দিয়ে একই দিনে চাকরির নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে তাদের যোগদান করিয়েছেন।
এছাড়া সদর দপ্তরের ১৫ মে তারিখের চিঠিতে মৌসুমি জনবল থেকে স্থায়ীকরণ-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও আপনি তা অমান্য করে নিয়োগ দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয়, আপনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে লোকজন নিয়োগে অনিয়ম করেছেন, যা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন কর্মচারী প্রবিধানমালা-১৯৮৯ এর পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য কেন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তার লিখিত জবাব আগামী তিন দিনের মধ্যে নিম্ন স্বাক্ষরকারীর কাছে দিতে হবে। জবাব দিতে ব্যর্থ হলে আপনার বিরুদ্ধে একতরফাভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসব বিষয়ে কেরু অ্যান্ড কোং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশারফ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সকল নিয়ম-নীতি মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তাহলে কেন স্থগিতাদেশ দেওয়া হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা হেড অফিস বলতে পারবে। অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটা আমি বলতে পারব না, আমার কাছে কেউ এমন অভিযোগ করেনি। এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্থগিতাদেশ জারির পরেও তড়িঘড়ি করে কেন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেনÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আদেশটা এসেছে সন্ধ্যার আগে। নিয়োগ প্রক্রিয়া তার আগেই সম্পন্ন করা হয়ে গেছে। নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়োগ কমিটি গঠন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া করা হয়েছে। সেখানে হেড অফিসের প্রতিনিধিও ছিল। আমি আমার জবাব দিয়েছি। আর কেন আমাকে শোকজ করা হয়েছে, সেটা হেড অফিস বলতে পারবে। তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করুন।
কেরুর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সদর দপ্তরের একমাত্র প্রতিনিধি ব্যবস্থাপক (সংস্থাপন) মো. সাইফুল আলম ১৪ মে লিখিত পরীক্ষার পর ঢাকায় চলে আসেন বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি কমিটির একজন সদস্য হিসেবে ১৩ ও ১৪ তারিখের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঢাকায় চলে আসি। তারা ১৫ তারিখে নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগ নিয়ে অর্থের লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমার নামে কেউ যদি এসব বলে থাকে, তাহলে সেটা সত্য নয়।
জানতে চাইলে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম এনডিসি কেরুর এমডির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে মতামত জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যেহেতু সবকিছু (নিয়োগ) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাই আপাতত এ বিষয়ে কথা বলার কোনো প্রয়োজন দেখছি না। পরে আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারব। বিষয়গুলো সম্পর্কে মন্ত্রী ও সচিব অবগত আছেন বলেও জানান তিনি। সবকিছু খতিয়ে দেখার জন্য নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে বিএসএফআইসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ আসে হেড (বিএসএফআইসি) অফিসে। এছাড়া মন্ত্রণালয়েও এ বিষয়ে যোগাযোগ করে ভুক্তভোগীরা। অর্থের লেনদেনের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেও টাকা নেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ আসার পর মন্ত্রণালয় থেকে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যানকে নিয়োগ বন্ধের আদেশ জারির কথা বললে ১৫ মে স্থগিতের চিঠি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় অবস্থিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আওতায় মোট পাঁচটি খাতের মধ্যে চিনি খাত লাগাতার লোকসান দিয়ে থাকে। কিন্তু মদ ও অন্যান্য খাত থেকে যা আয় হয় তা সমন্বয় করে গত কয়েক বছর ধরে কোম্পানি লাভের মুখ দেখে আসছে। কিন্তু একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কারণে ফের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে সম্ভাবনাময় এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।