আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৪ ১০:১৩ এএম
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টজয়ী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বুড়িশ্চর গ্রামের ডা. মো. বাবর আলী মঙ্গলবার রাতে দেশে ফিরলে ফুল দিয়ে তাকে বরণ করেন নিজ গ্রামবাসী। ছবি :ফোকাস বাংলা
‘হিমালয়ের ওই অঞ্চলে আমি আগেও গিয়েছি। এবার গিয়ে মনে হলো, হিমবাহ আগে যে জায়গায় ছিল তা অনেকটাই সরে গেছে। সেখানে অনেকগুলো হিমবাহের হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। এটা তখনই হয় যখন হিমবাহ গলতে থাকে আর চিকন হতে থাকে। এতে পর্বত আরোহণ কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, জলবায়ুর এই পরিবর্তনে আশপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশে বেশ বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।’
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্বত শিখর লোৎসে জয়ের পর সেখানকার জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের সন্তান ডা. বাবর আলী। গত ১৯ মে ষষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন বাবর। ঠিক এক দিন পরেই তিনি বিশ্বের চতুর্থ উচ্চতম স্থান লোৎসে পর্বতের শিখরে আরোহণের মাধ্যমে রেকর্ড গড়েন। বাবর আলীই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি একই অভিযানে হিমালয়ের দুই শৃঙ্গÑ এভারেস্ট ও লোৎসেতে পৌঁছেছেন। পর্বতারোহণের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডাবল হেডার’। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রাম মিলনায়তনে সেই দুঃসাহসী অভিযানের গল্পই বললেন ডাবল হেডার বাবর। সংবাদ সম্মেলন এবং পতাকা-প্রত্যর্পণ শিরোনামে অনুষ্ঠিত এ সভায় বাবর আলী বলেন, ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও তার প্রভাব দেখার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো হিমালয়। এটা শুধু পর্বত আরোহণই নয়, পরিবেশ রক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গবেষণার স্থানও। এখান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাই।’
বাবর আলী বলেন, ‘পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থেকে পৃথিবীকে দেখা সব পর্বতারোহীর কাছে স্বপ্নের মতো। আমি গর্বিত ও ভাগ্যবান, সে সুযোগ আমার হয়েছে। তিব্বতের দিকের দৃশ্যটি ছিল খুব সুন্দর। এত সুন্দর তিব্বতের সাইটটা। এভারেস্ট ও লোৎসে শিখর থেকে দেখা নিচের পৃথিবীর দৃশ্য এই জীবদ্দশায় ভোলা সম্ভব নয়। ওই মুহূর্ত জীবনে আর হয়তো আসবে না।’
এভারেস্টের চূড়ায় বাবর আলী ছিলেন ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট। পুরো সময় তিনি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া চূড়ায় অবস্থান করেছিলেন। এ ছাড়াও ক্যাম্প-৪ এ এক রাত কৃত্রিম অক্সিজেন না নিয়ে ঘুমান। সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া কেমন অনুভূতি হয়, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছি। খুব একটা কষ্ট হয়নি। খাড়া বাওয়ার সময় কিছুটা কষ্টের অনুভূতি হয়। ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে সেটাও আয়ত্তে নেওয়া সম্ভব।’ এমন পরীক্ষানিরীক্ষা করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অক্সিজেন সহায়তা ছাড়াই আট হাজার মিটারের কোনো একটা পর্বতশৃঙ্গ জয় করার ইচ্ছা আছে আমার।’ তবে কী আবার এভারেস্ট? এমন প্রশ্নের জবাবে খানিকটা হেসে উত্তর দিলেন, ‘না, না, ওটা অনেক খরচের ব্যাপার। আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার অনেকগুলো চূড়া আছে। এই মুহূর্তে আমি অন্নপূর্ণার কথা ভাবছি। তবে এটা চূড়ান্ত নয়।’ অন্নপূর্ণা হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গ, যার সর্বোচ্চ চূড়া অন্নপূর্ণা-১ এর উচ্চতা ৮ হাজার একানব্বই মিটার। উচ্চতার দিক দিয়ে মধ্য নেপালের এই চূড়ার অবস্থান পৃথিবীতে ১০ম।
গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে বাবর আলীকে বহনকারী প্লেন। বিমানবন্দরে বাবরকে স্বাগত জানাতে ভিড় জমান শুভাকাঙ্ক্ষীরা। দেশে বাবর আলীই প্রথম ব্যক্তি যিনি ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে এভারেস্ট জয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। দেশে ফেরার পর থেকে যেখানেই যাচ্ছেন সবার মধ্যমণি হয়ে উঠছেন তিনি। সবাই ছুটে আসছে তার সঙ্গে ছবি তোলার আবদার নিয়ে, শুনতে চাইছেন দারুণ এ কীর্তির গল্প। বাহবা দিচ্ছেন সবাই। এসব অনুভূতি কেমন, জানতে চাইলে বাবর বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে এখন আমি মিডিয়ার অ্যাটেনশন বেশি পাচ্ছি। তবে আমি আগের সময়টা মনে রাখতে চাই।’
পর্বত আরোহণ নিয়ে নিজের স্বপ্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে আরও অনেক টেকনিক্যাল মাউন্টেন আছে। আমি সেসব জায়গায় যেতে চাই। আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে যেসব পাহাড় চূড়ায় এখনও কেউ ওঠেনি, সেসব স্থানে যাওয়ার। সেখানে যদি নিজেকে দেখতে পাই, সেটা হবে বড় অর্জন।’
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন তার ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের’ সভাপতি দেবাশীষ বল, প্রধান উপদেষ্টা শিহাব উদ্দিন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এন ফয়সাল। পরে জাতীয় পতাকা প্রত্যর্পণের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
বাবর আলীর সফলতা উদযাপনে আগামী ২ জুন নগরীতে সাইকেল শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে চট্টগ্রামের সাইক্লিস্টরা। সেদিন সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে এভারেস্ট অভিযানের গল্প শোনাবেন বাবর আলী।