বিশ্ব জাদুঘর দিবস আজ
আসমা ফেরদৌসি, কীপার, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৫ ০৩:৩৮ এএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৫ ০৩:৪৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জাদুঘর বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করা হয়ে থাকে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট বিষয় নির্ধারণ করে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “The Future of Museums in Rapidly changing communities” যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় “দ্রুত পরির্বতনশীল সমাজে জাদুঘরের ভবিষৎ।”
এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে –সারা বিশ্বে যে সামাজিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে বর্তমান জাদুঘরগুলো কিভাবে ভবিষৎ জাদুঘর বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে ও খাপ খাওয়াতে পারে-এর প্রতি । সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর জন্যই এই দিনটি উদযাপন করা হয় প্রতি বছর। বরাবরের মতো দিনটিতে জাদুঘরের তাৎপর্য তুলে ধরার উদ্দেশ্যে জাদুঘরগুলো নানামাত্রিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয় — যাতে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক ও জাদুঘর অনুরাগীরা জাদুঘর বিষয়ক আরো আগ্রহী হয় এবং নাগরিকরা তার আপন ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাবতে শেখেন। কারণ জাদুঘর শুধু ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্থান নয় বরং এটি এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে জাতি-গোত্র নির্বিশেষে সকলেরই প্রতিনিধিত্ব করে।
সারাবিশ্ব যখন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ করছে সেখানে আইকমও এই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহযোগি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে আমরা দেখতে পাই যে, ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর টেকসই উন্নয়নের এক বা একাধিক লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য নির্বাচন করা হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়টি টেকসই উন্নয়নের ৩টি লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ৮, ৯ ও ১১-অর্জনে জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা আট (৮) হচ্ছে- সম্মানজনক কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। যেখানে জাদুঘরগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও পণ্যসম্ভারের প্রচার, প্রসারের মাধ্যমে একটি টেকসই পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাবে। মূলত জাদুঘরগুলোর কর্ম পরিধি দিন দিন আরো প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে জাদুঘরের পরিধি শুধু নিদর্শন প্রদর্শন ও সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর পরিধি ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। তাই সময়ের ব্যবধানে জাদুঘরের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হচ্ছে। আইকম কর্তৃক ১৯৪৬ সালের জাদুঘরের সংজ্ঞা থেকে ২০২২ সালের সংজ্ঞা অনেক প্রসারিত । এখানে জাদুঘরকে দেখানো হয়েছে মূর্ত-বিমূর্ত ঐতিহ্যগত বস্তু প্রদর্শন, সংগ্রহ , সংরক্ষণ এবং গবেষণাসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনোদন, জ্ঞান চর্চা ও আদান-প্রদানের স্থান হিসেবে।
এবারের আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসে টেকসই উন্নয়নের আরেকটি লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করা হযেছে যা হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা নয় (৯)। যেখানে প্রধান্য পাচ্ছে- শিল্প , উদভাবন ও অবকাঠামো । পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করে নতুন নতুন উদভাবন ক্ষেত্রে জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে সক্ষম ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়ে এটির প্রতি জোর দেয়া হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রা এগারো (১১) হচ্ছে- টেকসই নগারয়ন ও সমাজ। যেখানে বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রচেষ্টা জোরদার করা। মুলত বর্তমান বিশ্ব অতিদ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক, পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাদুঘরগুলি কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা নতুন করে ভেবে দেখা দরকার। একইসাথে পরিবর্তিত সমাজের আর্ন্ত:সম্পক নির্ণয় করে কিভাবে ভবিষৎ জাদুঘর গড়ে তুলতে হবে সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবারের জাদুঘরের প্রতিপাদ্য তৈরি করা হয়েছে।
আইকম-এর লক্ষ হলো আগামীর জাদুঘরগুলি কিভাবে ক্রমগত পরিবর্তনশীল বিশ্বে খাপ খাইয়ে নিতে এবং আরো উন্নত হতে পারে তা অনুসন্ধান করা, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। আগামীর জাদুঘরগুলিতে প্রদর্শন ব্যবস্থা প্রযুক্তির মাধ্যমে আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে করে তা দর্শকদের কাছে আরো উপভোগ্য ও আকর্ষণীয় করা যায়। সারা বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে জাদুঘর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থির হয়ে থাকতে পারে না। তাই জাদুঘরগুলোকে নতুন নতুন প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পটভূমিকে তুলে ধরতে পারি। এর জন্য গল্পবলার মত করে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে শ্রুতিমধুর করে আকর্ষণীয়ভাবে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কথা দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে পারি এবং পাশাপাশি প্রযুক্তির মাধ্যমে সক্রিয় ও সম্পৃক্ত করে তোলার মাধ্যমে দর্শকদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। এতে করে শিশুরা বিশেষ করে নতুন প্রজন্মরা জাদুঘরের সাথে সম্পৃক্ত হবে।
জাদুঘরগুলো দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট শৈল্পিক প্যানোরামার মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি মাধ্যমে ইন্টারক্টিভ করে তোলা আজ সময়ের দাবি। মোটাদাগে জাদুঘরগুলোকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যুগপোযোগি করে দর্শকদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মূল ভাবনা।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইকম) ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । এই কাউন্সিল-এর আহ্বানে ১৯৭৭ সালে প্রথম একটি থিম বা প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয় এবং সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইড থেকে তথ্যের ভিত্তিতে আইকম-এর সদস্য হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের মোট ১৭১টি দেশের ৩০ হাজারের বেশি সদস্য আইকম সাথে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশেও ৬০ জন আইকম-এর সদস্য রয়েছে।
পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যতো ইতিহাস জমা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মিউজিয়ন থেকে, যার অর্থ কাব্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হলো, যে গৃহে অদ্ভুত পদার্থ সমূহ সংরক্ষিত আছে এবং যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়। এ উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে।
ভারতীয় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা এ অঞ্চলের জাতিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূ-তাত্ত্বিক এবং প্রাণী বিষয়ক নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন— তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে জমির ব্যবস্থা করেন। ১৮০৮ সালে সেখানে জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ শেষ হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১৮১৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর ‘এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম’-এর জন্ম ও প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯১০ সালের এপ্রিলে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ঢাকায় আসলে জনগণের চাহিদা শুনে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবেন। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ১৯১১ এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯১২ সালের দিকে তিনি দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যারা বেশ কিছু পুরনো সামগ্রীর প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন এবং প্রদর্শনীটি দেখে লর্ডকারমাইকেল মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ঢাকায় একটি জাদুঘর তৈরি করবেন। ২ হাজার রুপি দান করেন জাদুঘরটির কাজ শুরু করার জন্য। অবশেষে ১৯১৩ সালের ৭ আগষ্ট লর্ড কারমাইকেল ঢাকা জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে এই জাদুঘর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নামে পরিচিতি পায়।
বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর আছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরই দেশের প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত। এই জাদুঘরের সংগ্রহে প্রায় এক লক্ষ নিদর্শন রযেছে এবং ৪৬ টি গ্যালারিতে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা সংস্কৃতিগত এবং প্রাকৃতিক নিদর্শনাদি প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৫ লক্ষ দর্শক বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করে। জাদুঘরটি জনগণকে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে । একটি অত্যাধুনিক , দর্শকবান্ধব ও ভবিষ্যতের জাদুঘর গড়ে তুলতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।