চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ৫ বছর আজ
ফয়সাল খান
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৫:০১ পিএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৫:৫৮ পিএম
অগ্নিকাণ্ড ঘটার পরও পুরান ঢাকা থেকে সরছে না কেমিক্যাল গোডাউন। এখনও কেমিক্যাল গোডাউনে ঠাসা পুরান ঢাকা। ছবি: সংগৃহীত
একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটার পরও পুরান ঢাকা থেকে সরছে না কেমিক্যাল গোডাউন। প্রায় ১৪ বছর চেষ্টা করেও এই ঘিঞ্জি এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এসব গোডাউন সরাতে পারেনি সরকারি প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান। সরকারিভাবে এগুলো ঢাকার শ্যামপুর ও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। তা ছাড়া শ্যামপুরের গোডাউনের ধারণক্ষমতা এত কম যে, সেখানে পুরান ঢাকার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর জায়গা হবে। ওদিকে মুন্সীগঞ্জ প্রকল্প এখনও শেষ হয়নি।
২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ১২৪ জন আগুনে পুড়ে মারা যান। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকা থেকে তখন রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা সরানোর দাবি জোরালোভাবে উঠে আসে। কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের উদ্যোগও নেয় সরকার। সেই প্রকল্পে ধীরগতির মধ্যে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকায় ঘটে আরেক ট্র্যাজেডি। চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে আগুন লেগে রাসায়নিক পদার্থের আগুনে পুড়ে মারা যান ৭১ জন।
আজ ২০ ফেব্রুয়ারি সেই চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির চার বছর। সে ঘটনার এখনও বিচার হয়নি। মেলেনি ক্ষতিপূরণ। পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এখনও রাসায়নিক গোডাউনে ঠাসা। যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে চুড়িহাট্টা বা নিমতলীর পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় বেশিরভাগ আবাসিক ভবনের নিচতলায় এখনও রাসায়নিক, সুগন্ধি ও প্লাস্টিকের ব্যবসা চলছে। ওয়াহেদ ম্যানশন সংস্কার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
তা ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ অনুযায়ী, বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে কোনো শিল্প ইউনিট আবাসিক এলাকায় এবং তার আশপাশে কাজ করতে পারে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে সেখানে এই ব্যবসা চালু রয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ব্যবসায় ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ এলাকায় কোনো রাসায়নিক কারখানা বা গোডাউনের অনুমোদনও দিচ্ছে না বিস্ফোরক অধিদপ্তর। এরপরও এখানে অবৈধ ২০ হাজারের বেশি কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে বহাল তবিয়তে। তবে ডিএসসিসির হিসাবে এ এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউনের সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৯২৪!
ডিএসসিসির মুখপাত্র আবু নাছের বলেন, ‘আমরা কেমিক্যাল গোডাউনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার লাইসেন্স দিচ্ছি না। এমনকি নবায়নও বন্ধ রেখেছি। এগুলো স্থানান্তর করার দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয়ের।’
জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘অস্থায়ী ভিত্তিতে রাসায়নিক সংরক্ষণের জন্য গুদাম নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার শ্যামপুরে ৫৪টি গুদাম নির্মাণ সম্পন্ন করে। বিসিআইসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন জানান, সরকারি তহবিল থেকে ৬২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত দুটি কোম্পানি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছে। তবে কোনোটিই স্থানান্তরিত হয়নি।’
সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুন মাসে। তখন শেষ না হওয়ায় ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। এই মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক প্রকল্পের পরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও মাটি ভরাটের কাজ চলাকালীন জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় প্রকল্পের ভৌত কাজের অগ্রগতি ৬১ শতাংশ।
৩১০ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৮০ কোটি টাকা খরচ হবে।
বিচার হয়নি, মেলেনি ক্ষতিপূরণ
অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার ও ক্ষতিপূরণ পায়নি চুড়িহাট্টার ক্ষতিগ্রস্তরা। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অগ্নিকাণ্ডের এক দিন পর নিহত হওয়া একজনের ছেলে বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিক মোহাম্মদ হাসান সুলতান, মোহাম্মদ হোসেন সুলতান ওরফে সোহেলসহ আটজনের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় আদালতে। অন্য আসামিরা হলেনÑ রাসায়নিক গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবাল, মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মোহাম্মদ নাবিল ও কাশিফ।
অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এপিপি মো. মাজহারুল হক জানিয়েছেন, অভিযোগপত্র দাখিলের প্রায় এক বছর পর গত ৩১ জানুয়ারি আদালত আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। মামলায় ১৬৭ জন সাক্ষী আছেন। তারা জামিনে আছেন। কাউকে এখনও জেরা করা হয়নি। আদালত মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১৪ মার্চ দিন ধার্য করেছেন বলে জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত মোহাম্মদ জুম্মনের ছেলে মামলার বাদী মো. আসিফুর রহমান অনিক বলেন, বছরের পর বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-জনপ্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। প্রতিশ্রুতির কিছুই পাননি তারা। ন্যায়বিচার সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কোনো ন্যায়বিচার হবে না। সব আলামত থাকার পরও চার্জশিট দিতেই পুলিশ তিন বছর সময় পার করেছে। অভিযোগ গঠন করতে আরও এক বছর সময় নিয়েছেন আদালত। দগ্ধ ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন মালিক।
অনিক বলেন, ডিএসসিসি প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ৮৯টি পরিবারের ৩১ জনকে চাকরি দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত করা হলেও সেই ফাইলটি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলেও উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো পরিবারগুলোকে কিছুই দেওয়া হয়নি।