আলী হোসেন মিন্টু
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:২৩ এএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:২৪ এএম
নাসিমা আক্তারের এই ছবিটি গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়। প্রবা ফটো
তিন দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত নাসিমা আক্তার। তাকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদবাগের বাসা থেকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে যান মেয়ে স্মৃতি। সঙ্গে ছিলেন নাসিমার বড় বোন রোকসানা। চিকিৎসককে দেখানোর জন্য মাকে পুরোনো ভবনের মেডিসিন ওয়ার্ডের প্রবেশমুখে বসিয়ে রেখে স্মৃতি যান বহির্বিভাগে টিকিট কাটতে। কিন্তু দেখানে দীর্ঘ লাইন। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মেলে টিকিট।
এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্বল শরীর নিয়ে বসে থেকে একসময় ওই সেখানেই শুয়ে পড়েন নাসিমা। এরপর তাকে কোনো মতে ধরাধরি করে ডাক্তারের কক্ষের সামনে নিয়ে গেলেও তাৎক্ষণিক তাকে সেবা দেওয়া যায়নি। সেখানেও ছিল দীর্ঘ সারি। অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে ভর্তি করানো গেলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত নাসিমা চিকিৎসার কোনো সুযোগই দেননি। শুক্রবার সকালে মারা যান তিনি। স্বজনরা জানান, এদিন বিকালে তাকে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর কদমতলী থানাধীন মিরাজ নগরের ‘সি’ ব্লকের ১১৩৪ নম্বর মোহাম্মদবাগের বাড়িতে মেয়ে স্মৃতিকে নিয়ে থাকতেন নাসিমা। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। দুই মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। তবে স্মৃতি মায়ের সঙ্গেই থাকতেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের মেডিসিন ওয়ার্ডের প্রবেশপথের পাশেই ড্রেনের স্লাবের ওপর শুয়ে আছেন নাসিমা। পাশেই চোখে মুখে এক রাজ্য হতাশা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে বসে আছেন তার বড় বোন রোকসানা। এ দৃশ্য দেখে তাদের কাছে ছুটে যান এ প্রতিবেদক। এভাবে কেন শুয়ে আছেন, কি হয়েছে প্রশ্ন করতেই রোকসানা বলেন, ‘আমার বোনের গত মঙ্গলবার থেকে জ্বর। ডাক্তার দেখাতে আসছি। আমার ভাগনি টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়েছে। এখনও আসেনি। দীর্ঘ সময় বসে থাকতে না পেরে শুয়ে পড়েছে।’
ঘণ্টা তিনেক দাঁড়িয়ে থেকে স্মৃতি টিকিট নিয়ে আসেন। এ প্রতিবেদকের সহায়তায় নাসিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় নতুন ভবনের দোতলায় ২০৯ নম্বর চিকিৎসকের কক্ষে। সেখানেও দীর্ঘ লাইন। সব প্রক্রিয়া শেষ করে বিকালে মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি মেলে নাসিমার। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মমতা, চিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই চিরবিদায় নিলেন।
স্মৃতি জানান, ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকরা রক্তের বেশ কয়েকটা নমুনা পরীক্ষার জন্য দিয়েছিলেন। রিপোর্টে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা রক্ত রেডি রাখতে বলছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্লাড গ্রুপ জানা ছিল না। ভর্তির পর চিকিৎসকরা তেমন কোনো গুরুত্ব দেননি অভিযোগ করে স্মৃতি বলেন, ‘ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর আমার মাকে কোনো প্রকার স্যালাইন দেওয়া হয়নি। চিকিৎসক ও নার্সদের ডাকলেও তারা কাছে আসেননি।’ এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
২১ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫৮ হাজার
ডেঙ্গুতে চলতি মাসের ২১ দিনেই ৫৮ হাজার আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ২৮৬ জন। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ৮৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ১৫৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৬৬৭ জন। ঢাকার বাইরে ১৪৮৬ জন। এ সময় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকার একজন এবং বাইরের তিনজন রয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৫২ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৭৭ হাজার ২৮৯ জন আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৬৩ জন। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে মোট ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৯০২ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৭৩ হাজার ৪১ জন এবং ঢাকার বাইরের ৯৭ হাজার ৮৬১।
এর আগে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে ২৮১ জন মারা যায়। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ৬২ হাজার ৩৮২ জন। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গু সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং মারা গেছে ১০৫।