ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৩ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৩ ১১:১৯ এএম
ফাইল ফটো
রাজধানীর শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে ১০টি ল্যাবরেটরি স্থাপনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্যাকিং হাউসটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে।
প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবের জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ গত বছর মোট ১১১ কোটি ৫৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকার মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন প্রকল্প পরিচালক জগত চাঁদ মালাকার। অথচ ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায় ওই যন্ত্রপাতি কেনা যেত। অর্থাৎ তিনি ৪২ কোটি ৭৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়েছেন বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) অভিযোগ এনেছে। বিষয়টির সত্যতাও পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।
এফএওর অভিযোগকে আমলে নিয়ে মন্ত্রণালয়টির যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা-২ অধিশাখা) মোহাম্মদ এনামুল হকের নেতৃত্বে গত ১০ জানুয়ারি ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। কমিটিকে এফএওর পর্যবেক্ষণ বা সুপারিশ বিবেচনা করে ১০টি ল্যাবের যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশন পর্যালোচনা ও ল্যাব যন্ত্রপাতি/রাসায়নিক দ্রব্যাদির বাজার দর যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
এরপর ১১ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে ১০টি বৈঠক ও একবার পরিদর্শন করে ৩১ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকল্প পরিচালক জগত চাঁদ মালাকারের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনটি পর্যবেক্ষণ ও সাতটি মন্তব্য করা হয়।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, ওই যন্ত্রপাতি কিনতে ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সময়মতো তদন্ত কমিটি গঠন করা না হলে জগত চাঁদ মালাকার ৪২ কোটি ৭৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা লুটপাট করতেন।
তিনটি পর্যবেক্ষণ হলো- প্রকল্প পরিচালক বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত ৪২ কোটিরও বেশি টাকা মূল্য দেখিয়ে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজালে (ডিপিপি) ১১১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি যুক্ত করেছেন। কমিটির সুপারিশ কার্যকর হলে ১০টি ল্যাবের বিপরীতে ৪২ কোটি ৭৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার সাশ্রয় হবে; ল্যাব ওয়ার্ক সম্পর্কে খুব কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকের মাধ্যমে স্পেসিফিকেশন তৈরি করা হয়েছে। এটি তৈরিতে কোনো ইক্যুইপমেন্ট ব্রোসিউরকে হুবহু নকল (কপি) করা হয়েছে; চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে (প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৪০ শতাংশ) ১৯টি মাইক্রোস্কোপ কেনার ব্যবস্থা অস্বাভাবিক। এ টাকায় সম্পূর্ণ কার্যকর কয়েকটি ল্যাব স্থাপন করা সম্ভব। অপরপক্ষে দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের জন্য একটি এক মিলি সেরোলজিক্যাল পাইপেট কেনার ব্যবস্থাও অপ্রতুল।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে অনিয়ম
পরিকল্পনা কমিশনের একটি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে- প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরির বয়স প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পর্যন্ত থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউস প্রকল্পের মেয়াদ অক্টোবর ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত হলেও জগত চাঁদ মালাকারের চাকরির বয়স ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তা ছাড়া মালাকার বর্তমান কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের বন্ধু বলে বিভিন্ন স্থানে বলে বেড়াচ্ছেন। এই প্রভাবেও তিনি বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
কৃষি মন্ত্রণালয় যথাসময়ে তদন্ত কমিটি গঠন না করলে জগত চাঁদ মালাকার ৪২ কোটি ৭৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা লুটপাত করতেন। ভুল তথ্য দিয়ে প্রকল্প পাস করানোর ক্ষেত্রে জগত চাঁদ মালাকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও চাওয়া হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।
এফএওর বিশেষ পর্যবেক্ষণ
মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের উপযোগিতা যাচাই না করেই প্রায় সব ধরনের গ্লাসওয়্যারের সংস্থাপন রাখা হয়েছে। ভারটেক্স মিক্সারের মতো খুবই সাধারণ এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ প্রস্তাব অস্বাভাবিক। এই যন্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হলে এইচপিএলসি অথবা এলসি-এমএসের মতো অপেক্ষাকৃত জটিল যন্ত্র অ্যানালিস্ট কীভাবে ব্যবহার করবে? কারিগরি অভিজ্ঞতা ব্যতীত উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবহার অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল অর্জনে কঠিন হবে। যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রায় ১০০টি আইটেম বাদ পড়েছে। ল্যাবে এসব না থাকলে ডিএইর অ্যানালিস্ট তা পুনর্নিরীক্ষা করবে এবং অনেকগুলো যন্ত্রের জন্য আলাদা রুম না পাওয়া গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এসব রুমের ব্যবস্থা করতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে ল্যাব সরঞ্জাম খাতের সব টাকা ব্যয় না করার পরামর্শসহ প্রশিক্ষণে ১০ থেকে ২০ টাকা যথেষ্ট।
এরই মধ্যে কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের সভাপতিত্বে প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির তৃতীয় সভা ২ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডিপিপি সংশোধন না করেই দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, ডিপিপি সংশোধন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাই দরপত্র হওয়ার কার্যাদেশ দেওয়ার আগে ডিপিপি সংশোধন করা হবে। সেই আলোকে ৬ মার্চ এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস ও প্রকল্প পরিচালক জগত চাঁদ মালাকারের মোবাইলে একাধিকবার কল দিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর প্রকল্প অনুমোদন করে। সময় ধরা হয় ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রকল্পটির ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয় জগত চাঁদ মালাকারকে।