× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নকশায় গলদ

‘হেলাফেলায়’ তৈরি ঢাকার যাত্রীছাউনি

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

ঢাকার যাত্রীছাউনিগুলোর বেহাল দশা। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকার যাত্রীছাউনিগুলোর বেহাল দশা। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সাভার যাবেন বলে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা বেজে ২০ মিনিটে ঢাকার চাঁনখারপুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের দক্ষিণ পাশের যাত্রীছাউনিতে দাঁড়িয়েছিলেন নিখিল ভদ্র। ‘ঠিকানা পরিবহন’-এর বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এ সময় হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। পথচারীদের অনেকেই দ্রুত এসে আশ্রয় নিলেন ছাউনির নিচে। কিন্তু আষাঢ়ের ত্যারচা বৃষ্টি থেকে রেহাই পেলেন না কেউ। চারপাশ খোলা থাকায় বাতাসের তোড়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে সবাইকে কমবেশি ভিজিয়ে দিল।


আক্ষেপের সুরে নিখিল ভদ্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানালেন, ‘ছাউনির নিচে দাঁড়িয়েও বৃষ্টিতে ভিজতে হলো। বাস এলে এখন ভেজা কাপড় নিয়েই উঠতে হবে। তাহলে ছাউনির সুবিধা কোথায়?’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেবল এই একটি নয়Ñ আবহাওয়া ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে নির্মাণ করা হয়েছে ঢাকার অধিকাংশ যাত্রীছাউনি। নকশাগত এই সীমাবদ্ধতার খেসারত দিচ্ছেন গণপরিবহনে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রী। সম্প্রতি ঢাকায় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে যাত্রীছাউনিগুলোর সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ভিজতে হচ্ছে যাত্রীদের। আবার তীব্র রোদেও মিলছে না স্বস্তি। ফলে রোদ ও বৃষ্টির দুই মৌসুমেই ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ আর তদারকিতেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা। ফলে কোথাও ছাউনির অংশ দখল হয়ে দোকান হয়েছে আবার কোনো অংশে চলছে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক ব্যবহার। চাঁনখারপুল এলাকার একটি যাত্রীছাউনির অংশ বর্তমানে দোকান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যাত্রীছাউনিগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির প্রণীত নকশা অনুসারে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ নকশা প্রণয়নের সময় দেশের আবহাওয়া ও ব্যবহারিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যাত্রীছাউনির নকশায় ‘ক্লাইমেট-রেসপনসিভ’ বা আবহাওয়াসহিষ্ণু ধারণা যুক্ত করা না হলে এগুলো যাত্রীবান্ধব ও নান্দনিক হবে না। এ প্রসঙ্গে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পরিবহন সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, জলবায়ু ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু বর্তমান নকশায় এসব বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। যথাযথ পরিকল্পনা, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে বলেই অনেক যাত্রীছাউনি এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।”


তিনি বলেন, “অনেক সময় নকশা ও বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত যাচাই হয় না। ফলে বাস্তবায়নের পর ত্রুটি ধরা পড়লেও তা সংশোধনের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।”

তবে ছাউনিগুলোর নকশা সম্পর্কে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেন, “এগুলো দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় নয়; বরং স্বল্প সময়ের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার স্থান। ছাউনিগুলো সম্পূর্ণভাবে ঘিরে দিলে হকারদের দখল ও অসামাজিক কার্যক্রমের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সে কারণে কাঠামো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।”

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজীব খাদেম বলেন, “ছাউনিগুলোতে যাত্রীরা অল্প সময় অবস্থান করেনÑ এ বিবেচনা থেকে নকশা করা হয়েছে। শেড বড় করলে বৃষ্টির পানি কম ঢুকত, তবে একদিকে ফুটপাতের সীমিত প্রস্থ, অন্যদিকে ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ক্ষতির ঝুঁকিÑ এ দুই কারণে তা করা যায়নি। নগর পরিকল্পনা বিভাগ থেকে বর্তমান নকশা তৈরি এবং পরে অনুমোদন করা হয়। ভবিষ্যতে আরও স্বাচ্ছন্দ্যকর ও পরিবেশবান্ধব যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”


ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৬১টি এবং উত্তর সিটিতে ১৬৮টি স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪৪টি ছাউনি নতুন নির্মাণ করেছে, মেরামতযোগ্য ১০টি ছাউনির মধ্যে ২টি ছাউনির মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে (বাংলামোটর মোড়ের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে)। আরও ৮টি ছাউনির মেরামতের কাজ প্রক্রিয়াধীন। বিভিন্ন স্থানে বাধার কারণে ৫টি ছাউনি নির্মাণ করতে পারেনি। শাহবাগ এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের কারণে ২টি ছাউনি নির্মাণ করতে পারেনি ডিএসসিসি। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ৬০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করতে পেরেছে।

যাত্রীছাউনি নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য সিটি করপোরেশনের কোনো পৃথক বাজেট নেই। ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এসব নির্মাণ ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। তবে নির্মাণ শেষে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য নেই নির্দিষ্ট জনবল বা আলাদা বাজেট। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণত এসব যাত্রীছাউনির উচ্চতা প্রায় ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ১৫ ফুট এবং প্রস্থ ৫ ফুট। অধিকাংশ ছাউনিতে টিনের ছাদ ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানভেদে বসার ব্যবস্থা রাখা হলেও জায়গার সীমাবদ্ধতায় অনেক ব্যস্ত এলাকায় আসন সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।


সরেজমিন ঢাকা গুলিস্তান, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইপাড়, মহাখালী, বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর, আজিমপুর, কুড়িল, সায়েদাবাদ ও মালিবাগ ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে ছাউনির লোহার রেলিং খুলে নেওয়া হয়েছে এবং ভাঙচুর করা হয়েছে টেম্পার্ড গ্লাসও। অধিকাংশ যাত্রীছাউনিতে যাত্রীরা বসছেন না। অনেক স্থানে হকার ও ভবঘুরেদের উপস্থিতি দেখা গেছে। আবার বাসস্টপ থাকলেও সেখানে নিয়মিত বাস থামে না।

এর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেস)’ প্রকল্পের আওতায় দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯টি করে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর অস্তিত্ব এখন আর দৃশ্যমান নয়।

যাত্রীছাউনি নির্মাণের স্থান নির্ধারণে সিটি করপোরেশন এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে স্থান নির্বাচন করেন।

তবে দক্ষিণ সিটিতে বিভিন্ন সময়ে স্থান সংকট ও স্থানীয় আপত্তির মুখে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানান, ‘রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ও ফুটপাতসংলগ্ন এলাকায় উপযুক্ত জায়গা পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দা বা ব্যবসায়ীদের আপত্তিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না।’ 


তবে উত্তর সিটির ট্রাফিক সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান জানান, যাত্রীছাউনি নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের এলাকায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। আর দক্ষিণ সিটির যেসব বাসস্টপেজে যাত্রীছাউনি করা সম্ভব হয়নি, সেখানে আপাতত রোড মার্কিং ও ট্রাফিক সাইনের মাধ্যমে স্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে জানান প্রকৌশলী রাজীব খাদেম।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, লাখ লাখ টাকার এসব স্থাপনা যেন কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো হয়ে না থাকে; বরং বাস্তবে রোদ-বৃষ্টি থেকে যাত্রীদের কার্যকর সুরক্ষা দেয় এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও ব্যবহারবান্ধব করে তোলে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা