ঘরে কয়েকদিন আগে মায়ের মৃত্যু হলেও বুঝতে পারেননি একই বাসায় থাকা মেয়ে। ছবি: ভিডিও থেকে
ঢাকা মিরপুরের পল্লবীতে একটি ফ্ল্যাটের আবর্জনায় ভরা কক্ষ থেকে ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার পচা-গলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের নাম নূরজাহান বেগম। তার এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক ও অপর ছেলে কানাডাপ্রবাসী। মেয়ে একই বাসায় থাকলেও তিনি মায়ের মৃত্যুর খবর কয়েকদিন পর্যন্ত টেরই পাননি। উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের এমন চরম অবহেলায় মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে।
গত রবিবার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের ৮ নম্বর সড়কের একটি বহুতল ভবনের চতুর্থতলার ফ্ল্যাট থেকে ওই বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই একই বাসায় নূরজাহান বেগমের মেয়ে থাকতেন, যার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক।
পুলিশের বর্ণনায় ঘটনাচিত্র
পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, লাশটি দেখে মনে হয়েছে তিনি তিন-চার দিন আগে মারা গেছেন। মৃতদেহে পচন ধরে মাংস খসে পড়ছিল। তিনি বলেন, ‘ওই বৃদ্ধা বাসার যে কক্ষে থাকতেন, সেটি রীতিমতো আবর্জনায় ভরা ছিল। দেখে মনে হয়েছে, কয়েক বছরে কেউ সেখানে প্রবেশ করেননি। মরে কয়েকদিন পড়ে থাকলেও মেয়ে তার মায়ের খোঁজ নেননি।’
পুলিশের ভাষ্যমতে, রবিবার মেয়ে মাকে ডাকতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে একজন নার্সকে খবর দেন। তার ধারণা ছিল, মা হয়তো অসুস্থ। পরে নার্স এসে দেখেন, বৃদ্ধা মারা গেছেন। নার্স বাইরে গিয়ে বিষয়টি জানালে প্রতিবেশীরা ৯৯৯-এ কল দেন।
ওসি হাসান বাসির বলেন, ‘বৃদ্ধার মেয়েকে দেখে আমাদের কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। মা মারা গিয়ে পচে আছেন অথচ তিনি গন্ধও পাননি। তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতার কারণে আমরা লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠাই।’ ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার লাশটি তার বুয়েট-শিক্ষক ছেলে গ্রহণ করেন। তবে মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও যুগ্ম সচিব ছেলে তাকে শেষবার দেখতে আসেননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
উদ্বিগ্ন সমাজ বিশ্লেষকরা
সমাজের উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মায়ের এমন করুণমৃত্যুর ঘটনাটিকে চরম নৈতিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের চিত্র হিসেবে দেখছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। সামাজিক মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক সমালোচনা।
নাজিয়া মুশরাত নিপা নামের একজন শিক্ষিকা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কেবল উচ্চশিক্ষা বা বড় বড় ডিগ্রি একজন মানুষকে মা-বাবার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে না; প্রকৃত সচেতনতা আসে সঠিক মূল্যবোধ থেকে।’ ফাহিমা আক্তার সুমি নামের এক সংবাদকর্মী বয়স্ক মা-বাবার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া বা তাদের বড় করাই যথেষ্ট নয়; শেষ বয়সে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সুরক্ষাবলয় কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একই সঙ্গে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে প্রতিবেশীদেরও খবর না রাখা সামাজিক বন্ধনের শিথিলতাকে নির্দেশ করে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
তবে পুরোপুরি কাউকে দোষারোপ করার আগে ঘটনার পেছনের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করার ওপর জোর দিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওই বৃদ্ধার কোনো মানসিক সমস্যা ছিল কি না, তা আগে দেখা প্রয়োজন। অনেক সময় কিছু মানসিক রোগের কারণে রোগীরা পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ করেন। সেক্ষেত্রে খুব কাছের মানুষের পক্ষেও সেবা দেওয়া জটিল হয়ে পড়ে। বৃদ্ধা এ ধরনের কোনো জটিল রোগে ভুগছিলেন কি না এবং সেই কারণে সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কি না, সেটাও বিবেচনায় রাখা উচিত।’
আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলা কীভাবে পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করছে, এ ঘটনা তারই অশনিসংকেত। নাগরিক সমাজ বলছে, প্রবীণদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।