ঢাকার পশুর হাট
বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ঢাকার পশুর হাট। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রবিবার দুপুরবেলা। রাজধানীর পশুর হাটে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি গরু ও ট্রাকের দীর্ঘ লাইন। কোথাও খড় নামানো হচ্ছে, কোথাও গরু নামাতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। হাটজুড়ে ভেসে আসছে গরুর ডাক, বেপারিদের হাঁকডাক ও ক্রেতাদের দরদামের শব্দ। মাথার ওপর তীব্র রোদ। গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ ও পশু উভয়ই।
আরও পড়ুন: দেওয়ানগঞ্জে পশুর হাটে মহিষের আক্রমণে নিহত ১, আহত ৬ |
বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। কিছুক্ষণ পরই নামে বৃষ্টি। তবে এই বৃষ্টি কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাটে ভোগান্তি তৈরি করে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, হাটের ভেতরে জমে যায় কাদা। এতে বিপাকে পড়েন গরু নিয়ে আসা বেপারিরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইজারা দেওয়া রাজধানীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ির খালি জায়গার হাটটি সীমানা ছাড়িয়ে শনির আখড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে হাটের কিছু অংশ তলিয়ে যায়, এতে গরু ও মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
এই হাটে কুষ্টিয়া থেকে ৬টি গরু নিয়ে আসা রহিম মিয়া বলেন, হাট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পানি অপসারণ করা উচিত, না হলে বড় সমস্যা হবে। গরুও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে ইজারাদার কেবি ট্রেডের প্রোপাইটার মো. শামীম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মোটরের মাধ্যমে দ্রুত পানি অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমি সরেজমিন দেখেছি। বেপারিদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।
পবিত্র ঈদুল আজহায় রাজধানীজুড়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ২৩টি পশুর হাট বসেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু, মহিষ ও ছাগল আসতে শুরু করেছে এসব হাটে। তবে সরবরাহ বাড়লেও এখন পুরোপুরি জমে ওঠেনি বেচাকেনা।
হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতার ভিড় থাকলেও বেশিরভাগই শুধু পশু দেখছেন। কেউ দাঁত পরীক্ষা করছেন, কেউ শরীর টিপছেন, কেউ আবার মোবাইলে ছবি তুলে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দামে না মিললে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন।
তেজগাঁও হাটের একপাশে ত্রিপলের নিচে বসে ছিলেন পাবনার আতাইকুলা থেকে আসা বেপারি মো. কুতুবউদ্দিন। পাশে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা রয়েছে তার গরুগুলো। তবে দীর্ঘ সময়েও একটি গরুও বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, তিনটি ট্রাকে মোট ৫৪টি গরু নিয়ে দুই দিন আগে এসেছেন, এখনও একটিও বিক্রি করতে পারেননি। একটি বড় গরুর দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, এটার ওজন সাড়ে ৮ মণ। দাম চাচ্ছি ৩ লাখ টাকা। মানুষ আসে, দেখে, দাম শুনে চলে যায়।
কুতুবউদ্দিনের ভাষ্য, এবার গরম ও বৃষ্টিই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে প্রচণ্ড গরম, বিকালে আবার হঠাৎ বৃষ্টি। তিনি বলেন, খোলা হাটে থাকি, অসুখ-বিসুখ হওয়ার ভয় আছে।
হাট ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বেপারি খোলা মাঠেই দিন কাটাচ্ছেন। রোদ ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ত্রিপলের নিচে ছোট ছোট অস্থায়ী আশ্রয় বানিয়েছেন তারা। সেখানে একসঙ্গে চলছে রান্না, খাওয়া ও বিশ্রাম।
গাবতলী হাটেও দেখা গেছে একই চিত্র। ক্রেতাদের আনাগোনা থাকলেও বেচাকেনা এখনও ধীর।
গরু দেখতে আসা মিরপুরের এখলাস উদ্দিন বলেন, আজ শুধু দেখতে এসেছি। কয়েকটি গরু পছন্দ হয়েছে। কাল এসে দরদাম করব।
একই হাটে গরু কিনতে আসা আরিফুল হক বলেন, আগেভাগে কিনলে দুই-তিন দিন লালন-পালনের সুযোগ থাকে। এতে শেষ মুহূর্তের ভিড়ও এড়ানো যায়। তবে দামের বিষয়ে তিনি এখনও নিশ্চিত নন। তার ভাষায়, গোশতের ওজন অনুযায়ী দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তবে আরও কয়েকটি হাট ঘুরলে বোঝা যাবে।
জামালপুর থেকে ৫০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন মো. আসলাম হোসেনসহ ১৩ জন বেপারি। তাদেরও এখনও কোনো গরু বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, ক্রেতারা আসছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, তারপর চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ এমন দাম বলেন, শুনলে কষ্ট লাগে।
তবে হতাশ নন এই বেপারি। তার আশা, ঈদের আগের দুই দিনেই বাজার জমে উঠবে। তিনি বলেন, ঢাকার মানুষ শেষ সময়ে গরু কেনে। বোনাস হাতে এলে বিক্রি বাড়বে।
হাটে এবারও দেখা মিলছে বাহারি নামের বিশাল আকৃতির গরুর। গাবতলী হাটে ‘কালো জামাই’ ও ‘সাদা জামাই’ নামে দুটি বড় ষাঁড় নিয়ে এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার খামারি ইয়াকুব আলী। তার দাবি, ‘কালো জামাই’-এর ওজন প্রায় ১ হাজার ৫০০ কেজি, দাম চাওয়া হচ্ছে ৫৫ লাখ টাকা। আর ‘সাদা জামাই’-এর ওজন প্রায় ১ হাজার ৩০০ কেজি, দাম হাঁকা হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া ‘নবাব’, ‘লাল বাদশাহ’ ও ‘সম্রাট’ নামের গরুও দেখা গেছে বিভিন্ন হাটে। এসব গরুর সামনে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। তবে বিক্রেতাদের দাবি, ভুসি, খৈল ও খড়সহ গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দামও কিছুটা বেশি। পাশাপাশি পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয়ও বেড়েছে।