ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির সংকট
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১৫:১৪ পিএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১৫:৪৯ পিএম
জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নালা-খাল ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে পৃথক ‘ড্রেনেজ সার্কেল’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয় পাঁচ বছর আগে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার’Ñ বাংলার এই পুরনো প্রবাদ বাক্যের মতোই বেকায়দায় পড়েছে এখন ঢাকার দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যক্রম। দায়িত্ব আছে, কিন্তু তা পালনের মতো প্রয়োজনীয় জনবল, কাঠামো ও পরিকল্পনাÑ কোনোটিই নেই এ দুই করপোরেশনের। ফলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি এলেই নগরবাসীর জন্য জলাবদ্ধতা এক অনিবার্য নিয়তি ও দুর্ভোগ হয়ে ওঠে।
জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা ওয়াসার দায়িত্বে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ছয়টি খাল ও চারটি বক্স কালভার্ট দেওয়া হয়। আর উত্তর সিটি করপোরেশন ছোট-বড় মিলিয়ে পায় ২২টি খাল। কিন্তু নালা ও খাল হস্তান্তর করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল দুই করপোরেশনকে দেওয়া হয়নি।
জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নালা-খাল ব্যবস্থাপনার জন্য দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে পৃথক ‘ড্রেনেজ সার্কেল’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয় পাঁচ বছর আগে। লক্ষ্য ছিল একটি বিশেষায়িত ইউনিট তৈরি করা, যা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণÑ সবকিছু সমন্বিতভাবে পরিচালনা করবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকা ওয়াসা থেকে দায়িত্ব হস্তান্তর হলেও ড্রেনেজ সার্কেল গঠনের প্রস্তাব এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায়। বিভিন্ন প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কাজ সামাল দিচ্ছে দুই করপোরেশন।
এদিকে বর্ষা ঋতু সামনে রেখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সংস্থার পরিবেশ সার্কেল ও অঞ্চলভিত্তিক কার্যালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে খাল পরিষ্কার, ড্রেন সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশনের অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন ড্রেনেজ সার্কেলের প্রস্তাবিত কাঠামোর ভিত্তিতে আংশিকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়; বরং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।
জনবল প্রস্তাব অনুমোদন মন্ত্রণালয় থেকে
এরই মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ সার্কেলের জন্য ৫৬ জনের জনবল প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়েছে। তবে এটি এখনও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ সার্কেল গঠনের প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে কিছু কোয়ারি দেওয়া হলে তা পূরণ করে পুনরায় পাঠানো হয়।
সংস্থা দুটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা একটি উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশেষায়িত কাজ। এর জন্য আলাদা প্রকৌশলী দল, হাইড্রোলজিক্যাল পরিকল্পনা, নিয়মিত মনিটরিং এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। কিন্তু এসব কিছু ছাড়াই কাজ চালাতে হচ্ছে তাদের, যা অনেকটা ‘বর্গায়’ দায়িত্ব পালনের মতো।
তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ড্রেনের নকশা পুরনো, কোথাও কোথাও দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ; একই সঙ্গে প্রয়োজন ওয়াসা থেকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব হস্তান্তর এবং বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিক করে তোলা।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ড্রেনেজ সার্কেলের প্রস্তাব এখন ক্যাবিনেট ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই এটি বাস্তবায়ন করা যাবে। এ বিষয়ে আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ শুরু
এদিকে ডিএসসিসির পরিবেশ সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি জোনে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অঞ্চল ১ থেকে ৫ পর্যন্ত এলাকায় কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। তারা বিদ্যমান ড্রেন বা পাইপ নেটওয়ার্ক পর্যালোচনা করবে এবং মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে কোথায় কী ব্যাসের পাইপ এবং কোথায় বক্স ড্রেন বা পাইপ ড্রেন দরকার তা জানাবে। আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বুড়িগঙ্গায় পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইসগেট বাড়ানো বা ক্যাচমেন্ট এরিয়া সম্প্রসারণের বিষয়ে সুপারিশ দেবে। এসব সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ কাজে পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে (আইডব্লিউএম) সিঙ্গেল সোর্স পদ্ধতিতে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের চিন্তা করছে ডিএসসিসি।
ডিএসসিসিতে জলাবদ্ধতার ৩৩ হটস্পট
এদিকে ডিএসসিসির ৩৩টি এলাকাকে জলাবদ্ধতার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকা হলোÑ ধানমন্ডি ২৭ (রাপা প্লাজা), গ্রিন রোড (রূপায়ন টাওয়ার), নিউমার্কেট (হকার্স মার্কেট ও সাইকেল স্ট্যান্ড), নায়েম গলি (ঢাকা কলেজের পাশে), ইস্কাটন গার্ডেন রোড (নেভি কলোনি), পলাশী (এসএম হলের সামনে), পিজি হাসপাতালের সামনে (সাকুরা হোটেলের নিকটবর্তী), ঢাবির মোকাররম ভবনের সামনে (ওয়াসা অফিস সংলগ্ন), পশ্চিম মালিবাগ এলাকা, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, আনন্দ বেকারি, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, টিটিপাড়া ট্রাক স্ট্যান্ড, মুগদা মেডিকেলের সামনে, গুদারাঘাট নৌকাপাড়ের সামনে, গোপীবাগ বড় মসজিদের সামনে, কমলাপুর রেলস্টেশনের বিপরীতে সামিয়া হোটেলের সামনে, শাপলা চত্বরের উত্তর-পূর্ব পাশে ফুটওভার ব্রিজের নিচে, নটর ডেম কলেজের সামনে, চানমারি মোড় (শাহজাহানপুর মোড়), সবুজকানন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গলি।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
জলাবদ্ধতা নিরসন বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান দরকার। এ ছাড়া ছোট ও সরু ড্রেন দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। চিকন ড্রেন দিয়ে আমরা মূলত অস্থায়ী সমাধান খুঁজছি। এতে অর্থ ও সময়Ñ দুই-ই নষ্ট হচ্ছে।’ জলাবদ্ধতা নিরসনের সক্ষমতা যাচাইয়ে শিগগির একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবেও জানান তিনি। যাদের সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্প নেওয়া হবে।
আসন্ন বর্ষা ঋতুর বিষয়টি মাথার রেখে জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামীতেও ঢাকা তলাবে বলে আশঙ্কা করছেন নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটসের (সিসিআর) আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নোমান সালমান। তিনি বলেন, ‘ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা কেবল খাল-ড্রেন পরিষ্কার করে সমাধান করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান; যেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, দ্রুত নিষ্কাশন এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদরাও বলছেন, ড্রেনেজ সার্কেল গঠন না হওয়ায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে একদিকে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেই প্রকল্পের সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংযোগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে নতুন সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের পরও জলাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে দায়িত্ব হাতে থাকলেও বাস্তব সক্ষমতার অভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দুই সিটি করপোরেশন অনেকটাই ‘নিধিরাম সরদার’ হয়ে উঠেছে।