আপাতত আটটি পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল ও এআই নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে ডিএমপি। ছবি: ভিডিও থেকে
ঢাকার সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে শুরু হয়েছে নতুন যুগ। এখন আর শুধু ট্রাফিক সার্জেন্টের উপস্থিতি নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) ক্যামেরাও নজর রাখছে প্রতিটি সিগন্যাল ও মোড়ে। আর এই নজরদারির প্রথম সপ্তাহেই রাজধানীতে তিন শতাধিক মামলা হয়েছে। নেই কোনো তদবির, নেই সার্জেন্টদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা কিংবা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদও। আইন ভাঙলেই ক্যামেরায় ধরা পড়ছে ছবি ও ভিডিও, এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হচ্ছে ডিজিটাল মামলা।
ঠিক কোন কোন মোড়ে বসানো হয়েছে এআই ক্যামেরা, সেটি স্পষ্টভাবে জানেন না অধিকাংশ চালক। ফলে রাজধানীর সড়কে তৈরি হয়েছে একধরনের নীরব আতঙ্ক। চালকদের ভাষ্য, এখন কোথায় ক্যামেরা আছে আর কোথায় নেই তা বোঝা যাচ্ছে না। এজন্য অনেকেই আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন।
একাধিক সিএনজি ও বাসচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে অনেকেই সিগন্যাল ভাঙা, উল্টো পথে ঢোকা কিংবা স্টপ লাইনের ওপর গাড়ি থামানোকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে নিতেন। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে ডিজিটাল মামলার ভয় কাজ করছে। চালকদের কেউ কেউ বলছেন, আগে সার্জেন্টের কাছে বুঝিয়ে বলা বা অনুরোধ করার সুযোগ ছিল, ক্যামেরার কাছে সেই সুযোগ নেই। তবে এই কঠোর নজরদারিকে ইতিবাচকভাবেও দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, ঢাকার রাস্তায় একজন আইন ভাঙলে অন্যরাও একই কাজ করেন। ফলে এআই নজরদারি চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা তৈরি করছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিগন্যাল ও মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, স্টপ লাইন অতিক্রম, অবৈধ পার্কিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ নানা ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করছে। পরবর্তীতে ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণ করে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি হচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক বা চালকের কাছে পাঠানো হচ্ছে নোটিস।
ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার কারণে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বাড়ছে। আগে সড়কে গাড়ি থামিয়ে মামলা করতে গেলে অনেক সময় তদবির, অনুরোধ কিংবা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হতো। এখন সেই সুযোগ অনেকটাই কমে এসেছে। কারণ আইন লঙ্ঘনের পুরো ঘটনাই ভিডিওতে সংরক্ষিত থাকছে।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরোয়ার বলেন, “এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরার আওতায় ট্রাফিক আইন অমান্য করায় গত এক সপ্তাহে তিনশোর বেশি মামলা হয়েছে। এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মামলা হবে”।
সোমবার দুপুরে উত্তরায় ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট উদ্বোধন শেষে তিনি বলেন, “ঢাকা মহানগরকে আধুনিকায়নের জন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্রসিং বা উল্টো পথে যানবাহন চলাচল করলেই ডিজিটাল মামলা হবে। যার বিরুদ্ধে মামলা হবে, সে নিজেই ভিডিওতে তার অপরাধ দেখতে পারবেন। শাস্তি নয়, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্যই এমন ব্যবস্থা”।
তিনি আরও জানান, আপাতত আটটি পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল ও এআই নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। শিগগিরই আরও অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই প্রযুক্তি বসানো হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ইতোমধ্যে এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক চালক এখন সিগন্যালের আগে থামছেন, স্টপ লাইন মেনে চলছেন এবং উল্টো পথে প্রবেশ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ব্যস্ত মোড়গুলোতে ট্রাফিক সার্জেন্টদের পক্ষে সব অপরাধ শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। নতুন প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতা কমাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে কোনো গাড়ি থামিয়ে মামলা করতে গেলে রাস্তায় যানজট তৈরি হতো। অনেক সময় চালক ও পুলিশের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক কিংবা উত্তেজনাও দেখা দিত। এখন ক্যামেরাভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে তা কমে আসছে। এতে একদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে আইন প্রয়োগেও স্বচ্ছতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ঢাকার সড়কে এখনও অবৈধ ও অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা অনেক। একই নম্বরপ্লেট ব্যবহার করে একাধিক গাড়ি চলাচলের অভিযোগও রয়েছে। ফলে ভুল ব্যক্তির কাছে মামলা পৌঁছানোর আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
পরিবহন শ্রমিক নেতা হানিফ খোকন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বিআরটিএর ডেটাবেজ হালনাগাদ ও নির্ভুল না হলে এই প্রযুক্তি শতভাগ কার্যকর হবে না। এ ছাড়া ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্রাফিক পরিবেশে অনেক সময় চালক পরিস্থিতির কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন, যা এআই সিস্টেম আইন লঙ্ঘন হিসেবে শনাক্ত করতে পারে”।
সংশ্লিষ্টদের বড় অংশ মনে করছে, রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের প্রযুক্তির বিকল্প নেই। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বহু আগে থেকেই এআইনির্ভর ট্রাফিক মনিটরিং চালু রয়েছে এবং তা কার্যকরও হয়েছে।
তবে ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য শুধু মামলা দেওয়া নয়; বরং সড়কে আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি করা। কারণ চালক ও পথচারী সবাই নিয়ম মেনে চললে তবেই কমবে বিশৃঙ্খলা, কমবে দুর্ঘটনা।