প্রজ্ঞা-আত্মার সভায় বিশেষজ্ঞরা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১৬:২৭ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে রবিবার “বাজেট ২০২৬-২৭: জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও তামাক রাজস্ব বৃদ্ধি” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা কথা বলেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
তামাক করকাঠামো কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, তামাক পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও কর বৃদ্ধি করা হলে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমবে এবং সরকারের বর্ধিত রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে রবিবার “বাজেট ২০২৬-২৭: জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও তামাক রাজস্ব বৃদ্ধি” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’ (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং ‘অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স’ (আত্মা) যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
সভায় বিশেষজ্ঞরা সিগারেটের বিদ্যমান মূল্যস্তর সংখ্যা কমানো, সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি প্রচলন এবং সব ধরনের তামাক পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন। সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা বা তদূর্ধ্ব মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের দাবি জানানো হয়।
এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের মধ্যে দামের পার্থক্য কম এবং প্রায় ৯০ শতাংশই এই দুই স্তরের ভোক্তা। স্তর দুটিকে একত্র করে দাম ১০০ টাকা করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সিগারেট ব্যবহারে বিশেষভাবে নিরুৎসাহিত হবে’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের তুলনায় তামাকপণ্য সস্তা, এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি। কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে তামাকপণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘কর আহরণ সহজীকরণে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতির প্রচলন অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ’।
চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, ‘তামাকপণ্যের দাম ও কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে গণমাধ্যমে আরও বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে’।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে আসন্ন বাজেটে তামাকবিরোধীদের কর ও দাম সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি’।
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম ও কর বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই’।
আলোচনা সভায় বিড়ি, জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রেও মূল্য ও করহার সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়। ২০ শলাকা ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ ও ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ, জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রতি ১০ গ্রাম ৬০ টাকা ও ৩০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সব তামাকপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। তামাকপণ্যের সহজলভ্যতাই এর প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের দাম শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের তুলনায় কম। তামাকপণ্যের মূল্য কার্যকরভাবে বাড়াতে ভারত, থাইল্যান্ড ও তুরস্কসহ বিশ্বের বহু দেশ অ্যাডভেলরেম পদ্ধতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করেছে।
আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আত্মা’র কনভেনর মতুর্জা হায়দার লিটন, প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। আলোচনা সভায় তামাকবিরোধী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।