শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যা
নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১০:২৩ এএম
আপডেট : ০৪ মে ২০২৬ ১০:৪০ এএম
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। ফাইল ছবি
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যার পর পরিকল্পিত রুট ধরেই দ্রুত সটকে পড়ে ঘাতকরা। নিখুঁত কিলিং মিশন শেষে টিমের সদস্যরা নিউ পল্টন হয়ে হাজারীবাগের খালেক লেনে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনায় জড়িত বা সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তদন্ত তদারক ও আন্ডারওয়ার্ল্ড সূত্রগুলো বলছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা ও পালানোর পরিকল্পনা সাজিয়েই ‘কিলিং মিশন’ সফল করে খুনিরা। যেখানে সার্বক্ষণিক সক্রিয় ছিল তিন স্তরের ব্যাকআপ টিম। মামলাটি ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বলার মতো অগ্রগতি নেই। তবে বেশকজনকে নজরদারিতে রাখছি। তাদের বিষয়ে পাওয়া তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করছি। সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে।
আন্ডারওয়ার্ল্ড ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টিটন হত্যাকাণ্ড তাৎক্ষণিক হামলা নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত কিলিং মিশন। আক্রমণ, নজরদারি ও পালানোর প্রতিটি ধাপই আগে থেকে নির্ধারণ করা ছিল। তিনটি ব্যাকআপ টিমকে আলাদা দায়িত্ব দিয়ে সাজানো হয় পুরো মিশন। একটি টিমের নেতৃত্বে ছিলেন সালাউদ্দিন ও সুজন; এ দলে ৪ থেকে ৫ জন সদস্য সক্রিয় ছিলেন। দ্বিতীয় টিমে ছিলেন রানা ও ‘বস’ সুজন। তৃতীয় টিমটির সমন্বয় করেন সালাউদ্দিন নিজেই, যিনি পুরো কিলিং মিশনের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন।
সূত্র জানায়, হামলার সময় নিউ বক্স কালভার্ট রোডের পোস্ট অফিস এলাকা, নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলের সামনে অবস্থান নেয় ব্যাকআপ টিমগুলো। তাদের কাজ ছিল হামলার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ও প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা দেওয়া। একই সঙ্গে হামলার পর ঘাতকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পথও নিশ্চিত করে তারা।
হত্যাকাণ্ডের মূল শুটার ছিল আলিফ। এর আগে ঢাকার আদালতপাড়ায় তারিক সাঈফ মামুন হত্যার ঘটনায়ও জড়িত ছিল আলিফ। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, টিটন হত্যাকাণ্ডের সময় আলিফের সঙ্গে আরেক সহযোগী ছিল, যিনি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। দুজনই মুখে মাস্ক পরা ছিল। গুলি চালানোর সময় আলিফের মাথায় ক্যাপ ও পরনে সাদা শার্ট ছিল।
ঘটনার দিন রাতে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে আসে খুনিরা। টিটনকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি করা হয়। তার কপাল, মাথা, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মোট ছয়টি গুলি লাগে। হামলার পরপরই পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে তারা। প্রথমে নিউ পল্টন হয়ে বক্স কালভার্ট ধরে এগিয়ে যায় এবং পরে হাজারীবাগের খালেক লেনে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাতকদের ব্যবহৃত রুট ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পালানোর কৌশল মাথায় রেখেই পুরো মিশনটি সাজানো হয়। শহরের ব্যস্ত এলাকাকে ব্যবহার করে দ্রুত গতিতে স্থান পরিবর্তন ও জটিল গলিপথে ঢুকে পড়ার পরিকল্পনা ছিল শুরু থেকেই।
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভাব্য পলায়নপথ, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) শওকত আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মামলাটি ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, একাধিক টিম সমন্বয় করে তদন্ত চালাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ঘাতকদের পালানোর পথ শনাক্ত করে সেই সূত্র ধরেই এগোচ্ছেন তদন্তকারীরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে গরুর হাটের সিডিউল নিয়ে পিচ্চি হেলাল বা টিটনের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিলÑ এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও মেলেনি।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেট এলাকার শাহ নেওয়াজ হলের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় টিটনকে। তিনি ছিলেন ঢাকার তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন এবং অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের স্ত্রী লীনার বড় ভাই। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর গত ৫ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান টিটন। এরপর থেকে তিনি যশোর ও ঢাকার মধ্যে যাতায়াত করছিলেন। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় মামলা করেছেন। মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকেই পিচ্চি হেলাল নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে আসছেন।