× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে পোড়া মার্কেটের টাকায়

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৭ পিএম

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৮ পিএম

রাজধানীর ‘গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাজধানীর ‘গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন বদলেছে, বদলেছে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র-প্রশাসক বদল হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু বদলায়নি রাজধানীর ‘গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার’ (পোড়া মার্কেট) প্রকল্পের ভাগ্য। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন তাদের এক হতাশার নাম। মার্কেটের বেজমেন্টে গড়ে ওঠা চার শতাধিক দোকান থেকে নিয়মিত কোটি টাকার ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যার কোনো অংশই সিটি করপোরেশনের কোষাগারে জমা পড়ছে না।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পূর্ব প্রাচীর থেকে মাত্র ২৫ কদম দূরে গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার বা পুরান বাজার মার্কেটের অবস্থান। ২০০৪ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে টিনশেড এই মার্কেটটি পুড়ে যায়। এরপর সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ ২২ বছরেও তা শেষ হয়নি। নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বেজমেন্ট অবৈধ দখলে চলে গেছে। চার শতাধিক দোকান গড়ে উঠলেও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এখনও ঝুলে আছে।

এই মার্কেটে দোকানের জন্য ২০১৪ সালে একটি টোকেন কিনেছিলেন ফেনীর বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম। সে সময় তিনি সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে ঢাকায় নিজের ব্যবসা গড়ে তুলবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে গেছে। দেশে ফেরার এক দশক পার হলেও দোকান বুঝে পাননি তিনি। বর্তমানে নিজ জেলা ফেনীতে ব্যবসা করছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৈধভাবে টাকা দিয়েও দোকান পাইনি। অথচ বেজমেন্টে অবৈধ দখলদাররা ব্যবসা করছে। আশা ছিল ঢাকায় ব্যবসা করব, কিন্তু মার্কেটই তো শেষ হয়নি।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, চারদিকে হকারে ঘেরা মার্কেটটি বাইরে থেকে চেনার উপায় নেই। চারতলা পর্যন্ত কাঠামো দাঁড়ালেও পলেস্তারা, টাইলস বসানো এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ এখনও বাকি। ভবনের ভেতরে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে হোলো ব্লক, ১০টি শাটার, স্যানিটারি সামগ্রী, ইট, বালু এবং একটি ঢালাই মেশিন। নকশা পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে টয়লেট, ওজুখানা ও নামাজের স্থান। এ ছাড়া ভবনের মূল ভিত্তি ও ওয়াটার রিজার্ভার ট্যাংকও ভেঙে পড়েছে, বেশকিছু জায়গায় টাইলসও ক্ষতিগ্রস্ত।

বেজমেন্টের প্রবেশপথগুলো উন্মুক্ত। পশ্চিম পাশের গেট দিয়ে নিচে নামতেই দেখা যায়Ñ পার্কিংয়ের কোনো জায়গা নেই; পুরো জায়গাজুড়ে স্থায়ী কাঠামো তুলে গড়ে উঠেছে দেশি গার্মেন্টসের পাইকারি বাজার। প্রবেশমুখে অস্থায়ী খাবারের হোটেল বসানো হয়েছে। বেজমেন্টে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার শতাধিক দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব বরাদ্দ নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা এবং ভাড়া আদায়ের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখায়।

জানা গেছে, বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করেছিলেন। এরপর থেকে বেজমেন্টের ভাড়ার কোনো অর্থ সিটি করপোরেশনের কোষাগারে জমা হয়নি। ভাড়া আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি ‘বাকিয়াত খাতা’ নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে সেটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

দায়িত্ব হস্তান্তর ও নথিপত্র বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও রয়েছে গুরুতর গলদ। সার্ভিস রুলস অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব নথি বুঝে নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে গেছে বা অনুপস্থিত রয়েছে, এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না; অবৈধ দখল থাকলে উচ্ছেদসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগ রয়েছে, পোড়া মার্কেটের বেজমেন্ট থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে, কিন্তু সেই অর্থ সিটি করপোরেশনের কোষাগারে জমা হচ্ছে না। বাস্তবে দোকান ও অতিরিক্ত ‘সার্ভিস চার্জ’ মিলিয়ে বছরে কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে, যার কোনো বৈধ হিসাব নেই সরকারি খাতায়। বেজমেন্টের ভাড়া বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট রেদোয়ান বিন মোস্তফা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গুলিস্তান পুরান বাজার মার্কেটের বেজমেন্ট থেকে কোনো ভাড়া আদায় করা হয় না। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও তার কাছে কোনো তথ্য নেই।’

জানা গেছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বেজমেন্ট দখলে নিয়ে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া আদায় শুরু করেন। শুরুতে ২৬৬টি দোকানের ভাড়া সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হলেও বাকি অংশ একটি চক্র নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এর একটি অংশ সিটি করপোরেশনের ভেতরের একটি গোষ্ঠীর কাছেও যেত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ চক্রের সঙ্গে মনোয়ার হোসেন মনু, আতিকুল ইসলাম, আবু হান্নান, হাসান ও আনিস জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা গা ঢাকা দেন।

বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করছেন নূরুল হাদী হক, জসিম উদ্দীন এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মনির হোসেন টিপু। নূরুল হাদী হক নিজেকে গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার (পুরান বাজার হকার্স) মার্কেট সমিতির আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ১ হাজার ৬৪৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা তিন কিস্তিতে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন, কিন্তু এখনও দোকান বুঝে পাননি। দ্রুত পঞ্চম তলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন করে ১ হাজার ৬৪৬ জনকে দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হোক।

অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রতিটি দোকান থেকে ভাড়ার বাইরে ‘সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিলের নামে টাকা করে আদায় করছেনÑ যার কোনো সরকারি হিসাব নেই। এ প্রসঙ্গে নূরুল হাদী হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা পজিশন দখল করে দোকান বানিয়েছে তারাই মাস শেষে ভাড়া তুলছে। আমরা শুধু সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিল নিচ্ছি। এর বাহিরে কোনো দোকান ভাড়া নিচ্ছি না। বিদ্যুৎ বিল আগে নিত পার ইউনিট ২৪ টাকা; আমরা নিচ্ছি ১৯ টাকা আর সার্ভিস চার্জ আওয়ামী লীগ নিত ১৭০০ টাকা আমরা নিচ্ছি ১২০০ টাকা।

এদিকে মার্কেট নির্মাণে একাধিক ঠিকাদার পরিবর্তন, কাজের ধীরগতি এবং চুক্তি বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭ সালে রূপাতলী বিল্ডার্স ও খান অ্যান্ড সন্স কাজ শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেনি। পরবর্তীতে ‘অর্পী ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ কাজ পেলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়। এর আগে অবকাঠামো ও স্থায়িত্ব পরীক্ষা করতে ‘সৃজনী-আরডিএস জয়েন্ট ভেঞ্চার’কে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভবনটি পূর্বের নকশা অনুযায়ী ১২ তলা করা যাবে কি নাÑ তা যাচাইয়ের জন্য বুয়েটের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দ্রুত ৪ তলা সম্পন্ন করে ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে বেজমেন্টের অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকৌশল বিভাগ থেকে সম্পত্তি বিভাগে নোট পাঠানো হলেও উচ্ছেদ হয়নি। এ বিষয়ে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের (পোড়া মার্কেট) বেজমেন্টে কোন দোকানগুলো বৈধ আর কোনগুলো অবৈধÑ সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’

হকার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন করতে ১৯৯৮ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে গুলিস্তান সিনেমা হলের পেছনে ১.০৮২২ একর অকৃষি খাস জমি দেওয়া হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা