× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ওরা খাদ্যের ‘আদু ভাই’

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৩ এএম

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২০ এএম

ঢাকার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ঘিরে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অনিয়মের অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ঘিরে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অনিয়মের অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগের খাদ্য ব্যবস্থাপনা তদারকি করে থাকে ঢাকার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়। কিন্তু এই অফিস ঘিরেই রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অনিয়মের অভিযোগ। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলি হওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এ কার্যালয়ে অনেকেই বছরের পর বছর একই পদে বহাল রয়েছেন। দুজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাজ করছেন কয়েক দশক ধরে। কোনো সরকারের সময়েই তাদের বদলি করা সম্ভব হয়নি। খাদ্য অধিদপ্তরে এ কর্মকর্তারা পরিচিত ‘খাদ্যের আদু ভাই’ নামে।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে এ কার্যালয়ে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক ‘আর্থিক লেনদেনের কারবার’। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনেক সময় ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে বদলি নীতিমালা অমান্য, কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন একই পদে অবস্থান ও দপ্তরের কতিপয় কর্মীর দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের চালচিত্র।

প্রয়োগ নেই বদলি নীতিমালার

সরকারি বিধি অনুযায়ী সাধারণত তিন বছর পরপর একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে অন্যত্র বদলি করার কথা। এতে এক জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থান করে প্রভাব বলয় তৈরির সুযোগ কমে যায়। কিন্তু এই কার্যালয়ের ক্ষেত্রে এ নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই কার্যালয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী একটানা ৮ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

খাদ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা বিভাগে কর্মরত অনেক খাদ্য পরিদর্শক বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়নের জন্য এই অফিসের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে এখানে কর্মরত কতিপয় কর্মচারীর প্রভাব সৃষ্টির ও অপপ্রয়োগের সুযোগও রয়েছে। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করার মধ্যে দিয়ে অনেক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফেলেছেন।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন লোকাল সাপ্লাই ডিপো (এলএসডি) ও খাদ্য গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা খাদ্য পরিদর্শক পদে পদায়ন পেতে অনেক সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। পদায়নের ক্ষেত্রে ‘বকশিশ’ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু কর্মচারীর কাছে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আবার বদলি বা পদায়নের আগাম তথ্য পেতেও কেউ কেউ অর্থ দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন খাদ্য পরিদর্শক বলেন, ‘এলএসডিতে কে কোথায় যাবে, সে বিষয়ে কিছু লোকের প্রভাব থাকে। আর সেই সুযোগেই অনেকে টাকা দাবি করে।’

তবে এসব অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ অনেক সময় ব্যক্তিগত অসন্তোষ থেকেও ছড়ানো হয়।’

সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের

অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা যায় না। অফিসে গেলে আগে কিছু কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কখনো কখনো তাদের মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নিতে হয়।’

কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এই অফিসে আসেন। এই যাতায়াতকে কেন্দ্র করেই কিছু কর্মচারীর প্রভাব খাটানোর সুযোগ ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে যার যোগাযোগ থাকে, তার কাজ দ্রুত হয়ে যায়। অন্যদের অপেক্ষা করতে হয়।’

সবচেয়ে আলোচিত দুজন

দপ্তরের ভেতর সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি পিএস ফারহানা ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে এই অফিসে এবং একই পদে কর্মরত রয়েছেন। অফিসে আসা খাদ্য পরিদর্শক বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পদায়ন বা প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফারহানা ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করে থাকি। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। দীর্ঘদিন এখানে আছিÑ কারণ কর্তৃপক্ষ আমাকে এখানেই দায়িত্ব দিয়েছে।’ 

আরেক কর্মচারী ফারুক হোসাইনের নামও বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত আলোচনায় উঠে এসেছে। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে একই দায়িত্বে রয়েছেন এবং তার কাছে বদলি সংক্রান্ত অনেক আগাম তথ্য থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদায়নের সময় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফারুক হোসাইন জানান, তিনি কোনো বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নন। তার বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো ভিত্তিহীন।’

খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই অফিসের পরিবেশ নিয়ে অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ রয়েছে। এই অফিসের চরিত্র বোঝা কঠিন। এখানে যার প্রভাব আছে, সেই সুবিধা পায়। ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অফিসে এমন অভিযোগ থাকা খুবই উদ্বেগজনক।

যা বলছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা

এ বিষয়ে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অফিসে বদলি ও পদায়ন সরকারি নীতিমালার ভিত্তিতেই করা হয়। কোনো কর্মচারী কত দিন এখানে আছেন বা থাকবেনÑ সেটি দপ্তরের প্রশাসনিক বিষয়। অনেক সময় দক্ষতার কারণে কাউকে বেশি সময় রাখা হয়। তবে যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়, অবশ্যই তা তদন্ত করা হবে।’ ফারহানা ইসলাম ও ফারুক হোসাইনের কার্যকাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তার কাছে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে দপ্তরের রেকর্ড দেখে জানানো যাবে।

এ বিষয়ে খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি দপ্তরে কেউ দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা হয়। বদলি বাণিজ্যের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাদ্য বিভাগের সেবা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।’

খাদ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বরত মহাপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, ‘আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়, ঢাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। এখানে স্বচ্ছতা রাখা জরুরি। অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়গুলো প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে খাদ্য বিভাগের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে নিয়মিত বদলি, প্রশাসনিক নজরদারি এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পদায়ন ব্যবস্থা চালু করা হলে অনেক অভিযোগ কমে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি নীতিমালা কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে এ ধরনের প্রশ্ন বারবারই উঠতে পারে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা