ঢাকা -১২
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৪ এএম
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২১ এএম
বিএনপি মনোনীত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (বাঁয়ে), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন (মাঝে) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব (ডানে)। কোলাজ ছবি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে তিন সাইফুলের লড়াইয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। রাজধানীর তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর (আংশিক) এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূল আলোচনায় রয়েছেন তিন সাইফুল।
তাদের মধ্যে বিএনপি মনোনীত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (কোদাল মার্কা), স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) সাইফুল আলম নীরব (ফুটবল) ও ১০ দলীয় জোটের মনোনীত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন (দাঁড়িপাল্লা) নিয়ে লড়াই করছেন।
এই তিনজনের জমজমাট লড়াইয়ে এখানে কোন প্রার্থী জয়ী হবে, তা ভোটাররাও ভাবতে পারছেন না। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আসনের প্রতিটি থানা ঘুরে ও ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে তারা আসনটি নিয়ে সঠিক কোনো চিত্র দিতে পারেননি। তবে কিছুসংখ্যক ভোটার নীরবের পাল্লা ভারী বলে জানিয়েছেন। মগবাজারে (হাতিরঝিল অঞ্চল) জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস হওয়ায় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন দাঁড়িপাল্লার মিলন। তবে আসনটিতে বিএনপির ভোটারও রয়েছেন শক্তিশালী পর্যায়ে। সেই ভোট ভাগ হবে কোদাল ও ফুটবলে, এতে সামান্য এগিয়ে যেতে পারে দাঁড়িপাল্লা।
এদিকে আসনটির বুক চিরে ঢাকামুখী একমাত্র রেললাইন চলে গেছে কমলাপুরে। এ রেললাইন ঘিরে মাদকের রমরমা কারবার চলে। তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল থানায় মাদকের চালান এ রোড ধরেই বেশিরভাগ অঞ্চলে সরবরাহ হয়। তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা যিনি এসব মাদক দূর করার প্রতিশ্রুতি দেবেন ও বাস্তবায়ন করবেন তাকেই আমরা প্রাধান্য দেব। আবার রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজারের মধ্যে কারওয়ান বাজার অন্যতম। তা ছাড়া মহাখালী বাস স্টেশনটি এই আসনে। এ দুটি স্থান ঘিরে সবচেয়ে বেশি স্থায়ী চাঁদাবাজির জায়গাও আসনটি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অবস্থানও এখানে। তাই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্থানও এটি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৮ জন। চারটি থানা নিয়ে গঠিত আসনটিতে বড় সমস্যা মাদকের রমরমা কারবার ও চাঁদাবাজি। তা ছাড়া তেজগাঁও অঞ্চলে প্রধান সমস্যা ড্রেনেজ, খাবার পানি ও গ্যাস সংকট। হাতিরঝিল এলাকায় মাদকের সঙ্গে নিরাপত্তাও প্রধান সমস্যা।
প্রার্থী পরিচিতি
বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন যুবদলের সাবেক সভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। জোটগত সমঝোতায় আসনটি হাতছাড়া হওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনি ‘ফুটবল’ প্রতীকে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন। এতে বিএনপি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠপর্যায়ে বড় একটি অংশ তার পাশেই দাঁড়িয়েছেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এখানে ধানের শীষের সমর্থনে ‘কোদাল’ নিয়ে লড়াই করছেন। বিএনপির একটি অংশ তার হয়ে কাজ করছে।
১০ দলীয় জোট তথা ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ মনোনীত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে লড়ছেন। এই আসন থেকেই নির্বাচনী মাঠে লড়াই করছেন আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান, গণসংহতি আন্দোলনের নেত্রী তাসলিমা আখতার (মাথাল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কল্লোল বণিক (কাস্তে), জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (লাঙ্গল) এবং ইসলামী আন্দোলনের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মাদ শাহজালাল (মোমবাতি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মোমিনুল আমিন (সিংহ), জনতার দলের ফরিদ আহমেদ (কলম), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোছা. সালমা আক্তার (আপেল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মুনতাসির মাহমুদ (ছড়ি), গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) আবুল বাশার চৌধুরী (ট্রাক) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান (কাঁঠাল) মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটারদের ভাবনা
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার বাসিন্দা মুফিজুর রহমান বলেন, এই আসনে তিন সাইফুলই শক্তিশালী প্রার্থী। তাদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। তবে নীরব যেহেতু এলাকার ছেলে, সে কিছুটা এগিয়ে আছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নীরবের লোকজনের বিপক্ষে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে।
একই এলাকার মাহবুবুর রহমান বলেন, কেউ মুখে স্বীকার করছে না কাকে ভোট দেবে। আগে সাধারণত মিছিল হতো তাতে বোঝা যেত কে কোন দলে? এবার সে ধরনের কিছু হচ্ছে না।
হাতিরঝিল অঞ্চলের রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এখন ভোটাররা নীরব। তারা কাকে ভোট দেবে, সেটি মুখে বলছে না। তবে ত্রিমুখী লড়াই হবে। একই এলাকার মুহিবুল হক বলেন, এখানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস হওয়ায় তারাই এগিয়ে রয়েছে। অন্য কথা বলেছেন একই এলাকার ফুল চাঁদ খান। তিনি বলেন, বিএনপির বহিষ্কৃত নীরব ও জামায়াতের মিলনের মধ্যে হাড্ডাহাডি লড়াই হবে।
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা
আসনটি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা সাইফুল আলম নীরব। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আল্লাহপাক আমাকে এ আসনের নির্বাচিত করলে এলাকার চাঁদাবাজি, মাদকের কারবার বন্ধ করতে সবাইকে নিয়ে পদক্ষেপ নেব। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং নির্মূল করা হবে। আমাদের আসনটি হবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে সামাজিকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস উপযোগী স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আপনি কারওয়ান বাজার, মহাখালী বাসস্ট্যাশনসহ বিভিন্ন স্থানে জবরদখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িত ও এসব কাজে সম্পৃক্তদের সহায়তা করছেনÑ এমন অভিযোগ রয়েছে। এই প্রশ্নের জবাবে নীরব বলেন, এটি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ। আমি চাঁদাবাজিসহ কোনো ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িত নই। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারবেন না। বরং অনেকেই চাঁদাবাজদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
নীরব বলেন, দোকাল মার্কা স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে সমঝোতা করছে। তারা এ আসন স্বাধীনতাবিরোধীদের দিতে নীলনকশা আঁকছে। আমাদের ভোটাররা কখনও তা হতে দেবে না।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা চাঁদাবাজি। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট। তারপর মাদক। গ্যাস, পানি, সুয়ারেজ ও জলাবদ্ধতা এই সমস্যাগুলো প্রায় সব এলাকায় রয়েছে। খেলার মাঠের সংকট। আর যেসব মাঠ আছে সেগুলোর বহুমুখী ব্যবহার করার চিন্তা আছে। হকারদের জন্য বিশেষ স্থান নির্ধারণ করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজট কমাতে হকারদের জন্য কোনো বহুতল ভবন করে দেওয়া হলে ভালো হবে।
আসনটি নিয়ে নিজের প্রত্যাশা সম্পর্কে মিলন বলেন, ঢাকা-১২ আসনের ভোটাররা ১০ দলীয় জোটকে ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছে। তারা একটি পরিবর্তন চায়। যে পরিবর্তন গত ৫৪ বছরে হয়নি। তাই আমরা প্রত্যাশা করি আসনটিতে দাঁড়িপাল্লা বিজয়ী হবে।