× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উত্তরায় আগুন

ভরপুর বাসাটি এখন মৃত্যুপুরী

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫ এএম

ভরপুর বাসাটি এখন মৃত্যুপুরী

রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িটি এখন শুধু একটি পোড়া ভবন নয়, এটি একটি পরিবারের নিঃশব্দ সমাধিস্তম্ভ। সেই ভবনের ষষ্ঠ তলায় বসবাস করতেন ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮)। আগুন নয়, দমবন্ধ করা ধোঁয়ায় সেখানেই নিভে গেছে তার, তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার এবং তাদের আড়াই বছরের শিশুপুত্র মো. রিশানের জীবন।

গতকাল শুক্রবার ওই ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে প্রথমে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফজলে রাব্বি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার। আর তাদের ছোট্ট সন্তান রিশান মারা যায় ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে। মুহূর্তের মধ্যে একটি কর্মজীবী, স্বপ্নময় পরিবার চিরতরে হারিয়ে গেল।

ফজলে রাব্বি ছিলেন কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার নানুয়াদিঘি পশ্চিমপাড়ার কাজীবাড়ির বাসিন্দা কাজী খোরশেদুল আলমের একমাত্র ছেলে। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজী বাড়ী। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের ভাতিজা। 

ফজলে রাব্বি কর্মরত ছিলেন ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে। তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার ছিলেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। দুজনই ছিলেন কর্মজীবী, স্বাবলম্বী, আধুনিক চিন্তার মানুষ। তাদের দুই সন্তান, বড় ছেলে ফাইয়াজ ও রাফসান থাকত উত্তরায় নানির বাসায়। গতকাল শুক্রবার অফিস ছুটির দিন হওয়ায় আগের রাতেই ছোট ছেলে রিশানকে নানির বাসা থেকে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন আফরোজা। সেটিই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত।

গতকাল সকালে আগুনের খবর পেয়ে একে একে হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনরা। তিন-তিনটি মৃত্যুসংবাদের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। নিহত ফজলে রাব্বির চাচা, সাবেক ব্যাংক নির্বাহী কাজী ফখরুল আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা লাশগুলো বুঝে পেয়েছি। যতটুকু জানতে পেরেছি, আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল ভবনের দোতলার রান্নাঘর থেকে। আমার ভাতিজা তার স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ষষ্ঠ তলায় থাকত। সেখানে আগুন পৌঁছায়নি। আমরা ধারণা করছি, তারা আগুনে নয়, মারা গেছে ধোঁয়ায়।’

তিনি বলেন, ‘রাব্বি নিশ্চয়ই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের বাসার চার ফ্লোর নিচে আগুন লাগায় তারা নামতে পারেনি। নিচ থেকে উঠে আসা কালো ধোঁয়াই তাদের শ্বাসরোধ করে দেয়। দোতলায় যাদের বাসায় আগুন লেগেছিল, তারা আগেই নিচে নামতে পেরেছিল বলেই বেঁচে গেছে। কিন্তু রাব্বি নামতে পারেনি স্ত্রী আর আড়াই বছরের শিশুকে নিয়ে।’

ফজলে রাব্বি ছিলেন কুমিল্লা জিলা স্কুলের ২০০৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। পরে ঢাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মেসিতে পড়াশোনা করেন। তার স্ত্রীও কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন। 

ফজলে রাব্বি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। কুমিল্লা শহরের প্রতি তার ছিল গভীর টান। চাচা কাজী ফখরুল আলম বলেন, ‘জিলা স্কুল, টাউন হল, ধর্মসাগর পাড়, বিশেষ করে নানুয়ার দিঘির পাড়Ñ এই জায়গাগুলোর প্রতি রাব্বির আলাদা দুর্বলতা ছিল। ঢাকায় থাকলেও বন্ধ পেলেই কুমিল্লায় ছুটে যেত।’

শেষ কথা কবে হয়েছিলÑ জানতে চাইলে তিনি থেমে গিয়ে বলেন, ‘শেষ কথা… তেমন কিছু হয়নি। তবে সবশেষ ঈদে আমাকে দুটো টি-শার্ট দিয়েছিল। আমি এখনও খুব যত্ন করে সেগুলো পরি। ওই দুইটা টি-শার্টই এখন আমার কাছে ভাতিজার দেওয়া শেষ স্মৃতি।’

গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় কাজী ফখরুল আলম জানান, তিনটি মরদেহ হাসপাতাল থেকে বুঝে নেওয়া হয়েছে। লাশবাহী গাড়ি কুমিল্লার দিকে রওনা দিয়েছে। রাত ১০টায় কুমিল্লা শহরের দারোগাবাড়ী মাজারে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ শনিবার সকালে মরদেহগুলো নেওয়া হবে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজী বাড়িতে। সকাল ১১টায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে।

একটি কর্মঠ পরিবার, দুটি অফিস ব্যাগ, শিশু রিশানের খেলনা আর ভবিষ্যতের অগণিত স্বপ্ন সবই এখন শুধুই ছবি। উত্তরার সেই ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাট এখন শূন্য। কিন্তু রয়ে গেল এমন এক শূন্যতা, যা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা