× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিরপুরে জিম্মি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, উচ্ছেদের নামে তামাশা

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০০ পিএম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৬ পিএম

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরুলেও রাজধানীর মিরপুরের ১.১৫ একর সরকারি জমি দখলমুক্ত করা যায়নি। মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ১ নম্বর সেকশনের কলওয়ালাপাড়ায় প্রধান সড়কের পাশেই অবস্থিত এই জমিটি দীর্ঘদিন ধরে দখলচক্রের কবজায়। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এই সম্পদ উদ্ধারে একাধিকবার উচ্ছেদ পরিকল্পনা হলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। বারবার সরকার বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি দখলদারদের দাপট।

সরকারি নথি অনুযায়ী, জমিটি মিরপুর হাউজিং এস্টেটের সেকশন-১-এর ব্লক-এফে অবস্থিত পুনর্বাসন প্লট নম্বর ৯২ থেকে ১০৫ এবং তৎসংলগ্ন সরকারি জমির অংশ। এলএ কেস নম্বর ১৩/৫৯-৬০-এর আওতায় জেলা প্রশাসন থেকে অধিগ্রহণের পর জমিটি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে জমিটি ছিল স্পষ্টভাবে ‘বাণিজ্যিক প্লট’ হিসেবে চিহ্নিত। তবে ১৯৯২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর করা একটি নকশায় হঠাৎ করেই এটি ‘পুনর্বাসন এলাকা’ হিসেবে দেখানো হয়। এই নকশাগত পরিবর্তনের পর থেকেই জমিটি ঘিরে দখলপ্রক্রিয়া শুরু হয়। একে একে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী জমির পজেশন নিয়ে দোকানপাট ও স্থাপনা নির্মাণ করে।

বর্তমানে এই জমিতে গড়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেট, সিটি মহল চাইনিজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট, বেস্ট বাই-রিগ্যাল ফার্নিচার, চন্দ্রবিন্দু, সিরাজ চুইগোশ, কফিলাইন ও এসি মার্টের মতো বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ লিজ বা বরাদ্দ ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

মিরপুর-১ গোলচত্বরের সনি স্কয়ারের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত এই বাণিজ্যিক এলাকাটি থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় হলেও রাষ্ট্রের কোষাগারে যাচ্ছে না এক টাকাও। সরেজমিন দেখা যায়, স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেটের একাংশ দোতলা, অন্য অংশ তিনতলা। সামনের পাকা স্থাপনার আড়ালে পেছনের অংশে গড়ে উঠেছে আধা কাঁচাপাকা ও টিনশেডের অসংখ্য দোকান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অবৈধ স্থাপনাগুলো ঘিরে গড়ে ওঠা ভাড়াচক্রের অর্থ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অপরাধী গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলে পৌঁছে। ভাড়ার একটি বড় অংশ শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্র ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ভাড়ার টাকা সংশ্লিষ্ট থানা ও দপ্তরেও নিয়মিত অর্থ পৌঁছানোর কথা স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।

ভাড়া আদায়ের চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু, মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন লিটু, সামসাদ আরা সাথী, আহমেদ আলী প্রেম ও ফখরুল ইসলাম ফরহাদ গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দোকানগুলো থেকে মাসে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করতেন। বছরে এই অঙ্ক দাঁড়াত প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কাউন্সিলর ও তার ঘনিষ্ঠরা আত্মগোপনে চলে গেলে তাদের পক্ষে বর্তমানে ভাড়া আদায় করছেন আহমেদ আলী প্রেম ও তৌহিদুর রহমান।

সরেজমিন গেলে দোকান মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক লক্ষ করা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানার কাগজপত্র দেখিয়ে হাজির হন এবং ভাড়া দাবি করেন। এ নিয়ে একাধিকবার মারামারি, ধাওয়া ও পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পজেশন দখলকে কেন্দ্র করে আহমেদ আলী প্রেম গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-২৩১১) করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফোনে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।’ তারপরই ফোনের লাইন কেটে দেন।

ভাড়াচক্রের সঙ্গে যুক্ত আরেক পক্ষের ফখরুল ইসলাম ফরহাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আমরা নিজেদের অর্থে এই মার্কেট নির্মাণ করেছি। এখানে ৩৮০টি দোকান রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের আগেও এই মার্কেট নিয়ে ঘাপলা ছিল, এখন তা আরও বেড়েছে।’ সরকারি জায়গায় কীভাবে মার্কেট নির্মাণ করা হলোÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি পক্ষ এই জমি লিজ নিয়েছিল, সেই পক্ষ আমাদের পাওয়ার দেওয়ায় এখানে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে।”

তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ওই জমি কাউকে কখনোই লিজ বা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো নথি তাদের রেকর্ডে নেই। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিটি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং সেখানে গড়ে ওঠা সব স্থাপনাই অবৈধ।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। জমিটি দখলমুক্ত করতে সংস্থাটি একাধিকবার কাগজে-কলমে উচ্ছেদ পরিকল্পনা করলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালেই প্রথম জমিটি উদ্ধারের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করা হয়। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক স্মারকে উচ্ছেদ অভিযানের প্রসঙ্গটি পুনরায় আলোচনায় আসে। এতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সচিব মনদীপ ঘরাই এবং ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা উপপরিচালক-১ মো. বশির গাজীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডেপুটি কমিশনারের ক্ষমতা প্রয়োগ করে অভিযান পরিচালনার পূর্ণ এখতিয়ারও তাদের দেওয়া হয়।

উচ্ছেদ প্রস্তুতির নথি অনুযায়ী, অভিযানে ২০ প্লাটুন পুলিশ, ১০০ দক্ষ ও ১০০ অদক্ষ শ্রমিক, পাঁচটি ভেকু ও ২৬টি ট্রাক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে মাঠপর্যায়ে সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এত বিশাল প্রশাসনিক প্রস্তুতি এখনও কাগজ আর নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

উচ্ছেদ কার্যক্রম সংক্রান্ত কোনো দাপ্তরিক চিঠি এখনও পাননি দাবি করে ঢাকা ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) আবু হোরায়রা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ম্যাজিস্ট্রেট দখলদারদের নোটিস দেবেন। নোটিস প্রদানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হলে ম্যাজিস্ট্রেট উচ্ছেদের তারিখ নির্ধারণ করবেন। এরপরই মাঠপর্যায়ের বাকি প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।”

অন্যদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) আবুল কাশেম মোহাম্মদ শাহজালাল মজুমদার বলেন, “আমি এ বিষয়গুলো ভালো জানি না। উচ্ছেদ প্রস্তাব ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ল্যান্ড শাখা থেকে হয়। আমার কাছে শুধু এস্টিমেট আসেÑ উচ্ছেদে কত টাকা লাগবে। মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ১ নম্বর সেকশনের জমি উদ্ধারের এস্টিমেটের বিষয়টি আমার নলেজে নেই।”

তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “উচ্ছেদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা