× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অরক্ষিত রাজধানীর রেললাইন

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪৬ পিএম

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৬ পিএম

রাজধানীর বেশিরভাগ অরক্ষিত রেললাইন দিয়ে এভাবে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। এমনকি দোকানপাট নিয়েও বসে যায় অনেকে। পাশ দিয়ে ট্রেন গেলেও তারা নির্বিকার। জুরাইন রেললাইন থেকে নেওয়া। প্রবা ফটো

রাজধানীর বেশিরভাগ অরক্ষিত রেললাইন দিয়ে এভাবে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। এমনকি দোকানপাট নিয়েও বসে যায় অনেকে। পাশ দিয়ে ট্রেন গেলেও তারা নির্বিকার। জুরাইন রেললাইন থেকে নেওয়া। প্রবা ফটো

আব্দুল্লাহপুর থেকে রাজধানীর গেন্ডারিয়াসহ প্রায় সব রেলক্রসিং অরক্ষিত ও খোলামেলা। প্রায় ৩ কোটি লোকসংখ্যার এই মেগা শহরে এসব রেললাইনের ওপর দিয়ে লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করছেন। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় রেলের অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং থাকলেও পুরো লাইনেই রয়েছে অবাধ চলাচলের সুযোগ। রেলক্রসিংগুলোর ওপর নিরাপত্তা ব্যারিকেড নেই। গেটম্যান নেই। এসব লাইনের ওপর দিনরাত ব্যাপক লোকসমাগম থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব রেললাইন নিয়ে দায়িত্বশীলদের চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপও নেই। 

আব্দুল্লাহপুর রেলসেতু থেকে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন পর্যন্ত কেউ চাইলে পার হতে পারেন, হাঁটতে পারেন লাইন ধরে। কিছু এলাকায় সবজি আর মাছের বাজার পর্যন্ত বসে রেললাইনের ওপর।

সরেজমিন দেখা গেছে, টঙ্গী রেলওয়ে সেতু পার হলে বামদিকে কোটবাড়ী এলাকা। স্থানীয়রা মুক্ত রেললাইনের ওপর দিয়ে কোটবাড়ী এলাকার তুরাগ নদের পাড়ের ওয়াকওয়ে দিয়ে বরাবর রেললাইন পার হচ্ছেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার নারী-পুরুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ লাইন দিয়ে আব্দুল্লাহপুরের দিকে মূল শহরে যাতায়াত করছেন। এর একটু সামনেই কোটবাড়ী রেলক্রসিং। অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত সামাদ মিয়া জানান, তিনি ১৬ বছর ধরে গেটম্যান হিসেবে কাজ করছেন। অনেক মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। কিছুদিন আগে একটি ষাঁড় কাটা পড়ে চলন্ত ট্রেনে। দেখা গেছে, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও চলাচল করছে এই রেললাইন ধরে। কোটবাড়ী ক্রসিং থেকে এগিয়ে গেলে পরবর্তী স্টেশন আদম আলী মার্কেট রেলক্রসিং। এই ক্রসিংয়ে কোনো গেট নেই। মানুষ মুক্তভাবে গাড়ি-রিকশা- হেঁটে চলাচল করছেন। 

এরপর নতুন স্লুইসগেট ক্রসিং যুক্ত করেছে পাবলিক কলেজ ও জয়নাল মার্কেট এলাকা দুটিকে। এখানে রেলক্রসিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছে মরচে পড়া লোহার চিকন পাইপ। এরপর উত্তরা ১০ নং রোড রেলক্রসিংয়ে চিকন বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। উত্তরার জসিমউদ্‌দীন রোড থেকে এপারের মুন্সিবাড়ী এলাকার সংযোগস্থলে এই রেলক্রসিং। স্থানীয় আলহামদুলিল্লাহ সেলুন ম্যানেজার জানান, দুই বছর ধরে এমন বাঁশের ক্রসবার দেখছেন। গেটম্যান সুলতান মিয়া জানান, এটি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত গেট। তারা দুজন এটার দায়িত্ব পালন করেন। তবে আরেকজনের দেখা মেলেনি। সুলতান মিয়া একাই এই রেলক্রসিংয়ের কাজকর্ম সামলান এবং ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করেন। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ছোট ছোট দুর্ঘটনা ঘটে। 

কুড়িল চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১ লাখ মানুষ এই রেললাইন পার হন। এখানে বিরতিহীন দ্রুতগামী ট্রেন চলাচল করে। কোনো রাস্তা বা গেট নেই, এমনকি সিগন্যালও। নিকুঞ্জ এলাকার ওভার ব্রিজ পার হয়ে প্রচুর লোক কুড়িল চৌরাস্তা কাজিবাড়ী, জোয়ার সাহারা, প্রগতি সরণি, পূর্বাচল এলাকার দিকে যায়। রেললাইনের পাশেই নরসিংদী, রূপগঞ্জসহ একাধিক গন্তব্যের বিআরটিসির বাস কাউন্টার থাকায় লোকসমাগম বেশি হয়। রেললাইনের ওপরে অস্থায়ী পোশাক ও চা-খাবারের দোকান। রেললাইন ঘিরে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। এখানে প্রধান সড়কে ওভার ব্রিজ থাকলেও, রেললাইনের ওপর দিয়ে কোনো ওভার ব্রিজ নেই। এ কারণে বিশ্বরোড নেমে প্রগতি সরণিমুখী সকল যাত্রীকে হেঁটে ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন পার হতে হয়। 

রাজধানীর মহাখালী রেলক্রসিং, কারওয়ান বাজার রেললাইন সম্পূর্ণ অরক্ষিত। লাইনের দুপাশে মানুষের অবাধ চলাচল। তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার রেললাইনের দুপাশে হাজার হাজার মানুষের সমাগম। পণ্য বিক্রিসহ বিভিন্ন কাজে লাইনের ওপর তাদের বাধাহীন চলাচল নৈমত্তিক ব্যাপার।

ঢাকার কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়ায় একাধিক সিগন্যাল স্টেশন থাকলেও উন্মুক্ত রেললাইনের ওপর দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল অব্যাহত আছে। সরেজমিন দেখা যায়, অনুমোদিত রেলক্রসিং ছাড়াও স্থানীয় মানুষজন নিজের সুবিধা অনুযায়ী রেললাইনের ওপর দিয়ে, নিজেদর মতো পারাপার হচ্ছেন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নং ওয়ার্ডের গোপীবাগ এলাকায় স্থানীয়রা রেললাইনের ওপর দিয়ে চলাচল করছেন। গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের একটু আগে মীর হাজারীবাগ এলাকার ঘণ্টিগর নামক স্থানে স্থানীয়রা লাইনের পাশের দেওয়াল ভেঙে রেললাইন পারপারের ব্যবস্থা করেছেন। ঘণ্টিগর থেকে দয়াগঞ্জ সিগন্যাল পর্যন্ত লাইনের ওপর দিয়ে মানুষ সড়ক পথের মতো যাতায়াত করছেন। 

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকা থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত মোট ৩১টি বৈধ রেলক্রসিং রয়েছে। তবে রাজধানীর অনেক জায়গায় স্থানীয় এলাকাবাসী নিজেরাই চলাচলের জন্য লাইনের ওপর প্রায় অর্ধশত ক্রসিং বানিয়েছেন বলে রেলপুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান।

খিলক্ষেত এলাকার আবুল হোসেন জানান, রেলেলাইনের ওপর বাজারসহ ভাসমান দোকান বসানোর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র রয়েছে। কুড়িল চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা মো. মকবুল হোসেন বলেন, রাজধানীর রেললাইন প্রায় পুরোটাই অপরাধ সংগঠনের জন্য উন্মুক্ত। কুড়িল এলাকার রেললাইনের ওপর স্থায়ী শেড দিয়ে খাবার ও পোশাকের দোকান নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, দোকানগুলোর জন্য রেললাইন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। গেন্ডারিয়া এলাকার হোটেল মালিক আরমান হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, গেন্ডারিয়া থেকে কমলাপুর সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন। অরক্ষিত রেললাইন সকল অপরাধের জননী। 

রাজধানীর রেললাইনের চারপাশে স্থায়ী সুরক্ষা নেই কেন এ নিয়ে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামানের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার কমলাপুর কার্যালয়ে গেলেও দেখা মেলেনি। খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ঢাকা রেল থানার অধীনে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮৪টি মৃতদেহের তথ্য তালিকাভুক্ত হয় এবং এ বিষয়ে অপমৃত্যু মামলা হয়। মৃতদেহগুলো রেললাইন থেকে উদ্ধার করা হয়। রেললাইনের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা অঞ্চলের ওসি জয়নাল আবেদীন জানান, রেললাইনের পুরো দায়িত্ব রেলওয়ে পুলিশের না। শুধু লাইনের ২ পাশে ১০ ফুট এলাকা রেলওয়ে পুলিশ দেখে। লাইনের নিরাপত্তা পুরোটা রেল পুলিশের পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব না। সে পরিমাণ জনবল আমাদের নেই। রেললাইনের পাশে ১৪৪ ধারা জারি করা থাকেÑ এমন বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এই বিষয়টি সত্য। তবে কে এটা বাস্তবায়ন করবে আমাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, রেললাইনে নিরাপত্তা রক্ষা করা আমাদের কাজ না। তিনি মানুষকে সচেতন হওয়ার কথা বলেন। রেললাইনের চারপাশে ১০ ফুট এলাকা ১৪৪ ধারা জারি আছে, তবে কে বাস্তবায়ন করবে এই আইন, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা