× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অসতর্ক নগরবাসী

গৃহকর্মীর মুখোশে অপরাধী চক্র

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:০৭ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তাদের সহায়তা করছে বিভিন্ন বাসার দারোয়ান ও কেয়ারটেকাররা। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে জানানোর পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা। ওই সংস্থার পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে। সেখানেও সঠিক নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই করেই গৃহকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির মালিক-ভাড়াটিয়াদের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের তথ্যও ক্রিমিনাল ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিআইএমএস) ইনপুট করতে হবে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা থেকে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে, অপরাধে জড়িতরা গৃহকর্মী হিসেবে অল্প সময়ের জন্য একাধিক বাসায় কাজ নেয়। কোথায় সিসি ক্যামেরা নেই, কোন বাসা দিনের বড় সময় ফাঁকা থাকে, শিশু বা বৃদ্ধ কারা থাকেনÑ এসব তথ্য সংগ্রহ করেই পরে সংঘটিত হচ্ছে খুন, চুরি ও পরিকল্পিত লুটপাট। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, যাচাইহীন গৃহকর্মী নিয়োগের সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধ বাড়বে। এ ছাড়া এটি অপরাধী চক্রের কৌশলেও পরিণত হচ্ছে, যা ঠেকাতে নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বিকল্প নেই।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সারা দেশের মানুষের মধ্যেই গৃহকর্মী নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, ব্যস্ত ঢাকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ঘর ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত নানা কাজে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবারেই দিনের বড় একটি সময় গৃহকর্মীর হাতেই থাকে পুরো বাসার দায়িত্ব। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আগে গৃহকর্মীর পরিচয়, ঠিকানা বা পূর্ব ইতিহাস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নেই ন্যূনতম সতর্কতা। পুলিশ ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানছেন না নগরবাসী। ফলে গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীরা সহজেই প্রবেশ করছে ঘরে ঘরে।

মোহাম্মদপুরের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এলিফেন্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এর মধ্যেই গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়তে থাকায় ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গৃহকর্মী নিয়োগে ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করে। পাশাপাশি আদালত থেকেও ২০২০ সালে ৬ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুলিশ সূত্র জানায়, চলতি মাসেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচটি গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে খুন, চুরি ও পরিকল্পিত প্রতারণা।

ডিএমপির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গৃহকর্মী নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, সদ্য তোলা ছবি, শনাক্তকারী ব্যক্তি ও তার পরিচয় সংগ্রহ করতে হবে। পূর্ব কর্মস্থল ও কাজ ছাড়ার কারণ যাচাই করতে হবে। সব তথ্য নিকটস্থ থানায় জমা দিয়ে ডিএমপির নির্ধারিত ‘ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম’ পূরণ করার কথা বলা হয়েছে। নিয়োগের পরও রয়েছে করণীয়Ñ গৃহকর্মীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বাসার প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, মূল্যবান জিনিস গোপন রাখা, শিশুদের একা না রাখা, সন্দেহজনক আচরণ নজরে রাখা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনার কোনোটিই মানছেন না অধিকাংশ নগরবাসী। এমনকি অনেকের কাছেই এসব নির্দেশনার অস্তিত্ব অজানা।

২০২০ সালে মাহফুজা চৌধুরী পারভীন হত্যা মামলার রায়ে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ৬ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ, গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা, বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ। অথচ এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নগরবাসী ‘ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম’ পূরণ করে থানায় জমা দেন না। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাসাবাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ছাড়া গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু বলেন, ক্রিমিনাল ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিআইএমএস) মাধ্যমে ঢাকার ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকদের তথ্য সফটওয়্যারে ইনপুট করা হচ্ছে। বাড়ির মালিকদের মাধ্যমে গৃহকর্মীরাও এর আওতায় আসবেন। মোহাম্মদপুরের ঘটনার পর বাড়ির মালিকদের নতুন বুয়া বা ভাড়াটিয়া নেওয়ার সময় এনআইডি ও শনাক্তকারী ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ফেসবুক গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ ও অনানুষ্ঠানিক এজেন্সির মাধ্যমে গৃহকর্মী নিয়োগের প্রবণতাও বেড়েছে। কিন্তু এসব প্লাটফর্মে পরিচয় যাচাই বা পূর্ব ইতিহাসের কোনো নিশ্চয়তা নেইÑ যা অপরাধীদের জন্য নতুন ঝুঁকির দরজা খুলে দিচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরজীবনের আর্থিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও মাদকাসক্তির সঙ্গে নাগরিক অসচেতনতা যুক্ত হয়ে গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্থায়ী ঠিকানা যাচাই, থানায় গৃহকর্মীর তথ্য সংরক্ষণ এবং সন্দেহজনক আচরণে দ্রুত পুলিশে জানানোই হতে হবে প্রধান করণীয়। তার মতে, নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা