প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৪০ পিএম
বাল্যবিবাহ বন্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় অগ্রগতি হলেও এখনও পিছিয়ে রয়েছে রংপুরের দুর্গম এলাকাগুলো। এসব অঞ্চলে বাল্যবিবাহ মহামারি আকারেই রয়েছে। অঞ্চলটিতে বর্তমানে বাল্যবিবাহের হার ৫৮.৯ শতাংশ। এ অবস্থায় কৈশোরকালীন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ, আইসিডিডিআর,বি, আরডিআরএস বাংলাদেশ এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির উদ্যোগে ‘মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য: প্রমাণভিত্তিক তথ্যের ব্যবহার নীতি ও কর্মপর্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এক গবেষণায় এসব তথ্য উপস্থাপন করে। রাজধানী ঢাকার হোটেল আমারিতে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞেরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেমিনারে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য সেবায় সর্বশেষ অভিজ্ঞতা, প্রমাণভিত্তিক অগ্রগতি ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপগুলো উপস্থাপন করা হয়— বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের সেবার মানোন্নয়নে।
রংপুরের দুর্গম এলাকাগুলোতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাল্যবিবাহের হার ৫৮.৯ শতাংশ ও জাতীয় হার ৫০.১ শতাংশ। কিশোরী গর্ভধারণের হার ১৭.৩ শতাংশ, যা জাতীয় হার ৫.৯ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় হারের দ্বিগুণ। এসব অঞ্চলে প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে প্রায় ৬ জনের বিয়ে হয় এবং তাদের বেশিরভাগই গর্ভধারণের অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে।
এ দিকে এসব অঞ্চলের লোকজন সরকারি সেবার পরিবর্তে বিকল্প সেবার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর কারণের মধ্যে রয়েছে, ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক সুবিধার অভাব। এমনকী ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পণ্য/সরঞ্জামের অভাব। এ অঞ্চলে ৫০.৩ শতাংশ গর্ভবর্তী বাড়িতে সন্তান প্রসব করে। এসবের কারণ হচ্ছে- দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক রীতি, অর্থনৈতিক সংকট, সীমিত শিক্ষা সুযোগ এবং দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকার ফল। ঘরোয়া প্রসবের হার ৫০ শতাংশের বেশি থাকায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করতে সেবা প্রদানকারীর প্রতি আস্থা বৃদ্ধি জরুরি বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মিডওয়াইফ-কেন্দ্রিক মেন্টরশিপ মডেল’-এর ফলে মিডওয়াইফ ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের জ্ঞান, মনোভাব, অনুশীলন ও দক্ষতা গড়ে ৫০ শতাংশ উন্নত হয়েছে। জননী প্রকল্প ও বাংলাদেশ প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সমিতির বিশেষজ্ঞরা এই মডেলকে টেকসই ও প্রসারযোগ্য সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন— যা প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক হবে।
সেমিনারে অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের উপ-পরিচালক ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ রায়হানুজ্জামান সরকার বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নের মাইলফলকে পৌঁছাতে আমাদের আরও কাজ করাতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও সমন্বিত করতে হবে। আজকের এই রিপোর্টের উপস্থাপনা দেখিয়েছে— সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে আমরা এসব উদ্যোগকে সম্প্রসারণ করতে পারি এবং এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ ছাইদুল হকও বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে ৪ দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- দুর্গম এলাকায় মানবসম্পদ ঘাটতি পূরণ ও মেন্টরশিপ জোরদার করতে হবে; জাতীয় মাতৃ ও নবজাতক প্রোগ্রামে মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন সেবার অগ্রাধিকার দিতে হবে; বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণের সমাধান করতে হবে এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সক্ষম করতে হবে।
তা ছাড়া অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা গবেষণা-ফলাফল ব্যবহার করে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জন এবং সারা দেশে সেবা বৈষম্য কমানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, জননী প্রকল্প রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায় ‘জননী: মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প নামে সব উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি, সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়ার মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদী এই উদ্যোগে অর্থায়ন করছে।