× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভোগান্তির অপর নাম রাজধানীর লোকাল বাস

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:২০ এএম

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:২১ এএম

গ্রাফিক্স, প্রবা

গ্রাফিক্স, প্রবা

ব্যস্ত সড়কে বাস-লেগুনার হর্নে দিনের শুরু হয় রাজধানীবাসীর। বাইরে থেকে সবকিছু কত প্রাণবন্ত, কিন্তু এই জীবন্ত চিত্রের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ কষ্ট। কারণ যাদের দিন শুরু হয় লোকাল বাসে চেপে, তাদের কাছে সকাল মানেই ভোগান্তির আরেক নাম। সময়মতো বাস না পাওয়া, অতিরিক্ত ভিড়, দাঁড়িয়ে যাতায়াতÑ প্রতিটি সকাল যেন যুদ্ধের মতো। তবু জীবিকার তাগিদে মানুষ এই কষ্ট নিয়েই পা বাড়ায়, আশায় থাকে হয়তো আজ একটু ভালো যাবে, কিন্তু প্রতিদিনই তাদের হতাশ হতে হয়।

শাহনাজ কবির একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত এবং কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। জানালেন, আমি প্রতিদিন সকাল ১০টায় অফিস যাওয়ার জন্য বাসে উঠি। কিন্তু জ্যামে আটকা পড়ে বাস কখনোই সময়মতো পৌঁছয় না। জিয়া কলোনি থেকে মহাখালীতে যেতে যেতে কখনও ১০টা পার হয়ে যায়। ফলে অফিসে পৌঁছাই ১১টার পর।

শাহনাজের মতোই রাজধানীর লাখো মানুষ প্রতিদিন এই ভোগান্তির সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। বাসগুলো প্রায়ই সময়মতো আসে না, কেউ কেউ ভাড়া বৃদ্ধির চাপ দেয় আর বাড়তি ভাড়া আদায়ে যাত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ তো আছেই। এসব কারণে মানসিক চাপ বাড়ে এবং দিনের শুরুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতা, সঠিক রুট পরিকল্পনার অভাব এবং যানজট নিয়ন্ত্রণের অভাবে এই ভোগান্তি প্রতিদিন বাড়ছে। শুধু সময়ের ক্ষতি হচ্ছে না, বরং মানুষের মানসিক শান্তি, কর্মক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপন্ন হচ্ছে।

সাইফ হাবিব বাসাব থেকে ‘রাইদা’ নামের লোকাল বাসে উঠেছিলেন জরুরি একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে। সময়মতো পৌঁছানো তার জন্য খুব জরুরি ছিল। কিন্তু বাসে উঠেই তিনি পড়লেন একের পর এক ঝামেলায়। বাসচালক বারবার অযথা গাড়ি থামিয়ে রাখছিলেন, আবার চললেও অত্যন্ত ধীরগতিতে। এতে যাত্রীদের মধ্যে বিরক্তি বাড়তে থাকে। ক্রমে বিষয়টি নিয়ে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। সাইফসহ কয়েকজন যাত্রী চালক ও হেলপারের কাছে দ্রুত বাস চালানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে উত্তেজনা এমনভাবে বাড়ে যে, পরিস্থিতি হাতাহাতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাসের ভেতর অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়, যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) প্রকাশ করেছে বাস সার্ভিসেস ইন ঢাকা সিটি-ইউজার্স এক্সপিরিয়েন্সেস অ্যান্ড ওপিনিয়ন্স শীর্ষক গবেষণা। এখানে দেখা যায়, যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় ঢাকার বাসসেবা অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য এবং অমানবিক। অধিকাংশ যাত্রী অভিযোগ করেন, চালক-হেলপারের অসভ্য আচরণ, দরজা বন্ধ না করে বাস চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ও বাসে চেঁচামেচিÑ এসব তাদের প্রতিদিনের যাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। 

আইডেন্টিফাইং এক্সিস্টিং বাস সার্ভিস কন্ডিশন অ্যান্ড অ্যানালাইজিং সার্ভিস-কোয়ালিটি, যা সায়েন্টিফিক রিসার্চ পাবলিশিং (এসসিআইআরপি)-এ প্রকাশিত। এই গবেষণায় ঢাকার পাঁচটি স্থানে যাত্রী জরিপ করা হয় এবং দেখা যায়Ñ সময়নিষ্ঠা, নিরাপত্তা, বাসের পরিচ্ছন্নতা প্রত্যেক ক্ষেত্রেই যাত্রীরা ব্যাপক অসন্তুষ্ট। গবেষকরা উল্লেখ করেন, রুট-রেশনালাইজেশন না থাকা, অতিরিক্ত বাস প্রতিযোগিতা এবং হঠাৎ থামা বাসসেবার মানকে আরও খারাপ করে তুলছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি যাত্রী মনে করেন, বাসসেবায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।

২০১৮ সালে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় জানা যায়, তীব্র যানজটের কারণে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির সমান। এতে রাজধানীতে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। যানজটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গণপরিবহনে। দিনব্যাপী চাপের কারণে বেশিরভাগ বাস নির্ধারিত রুটে পাঁচবারের বেশি চলাচল করতে পারে না। ফলে ব্যস্ত সময়ে যাত্রীরা বাসের সংকটে পড়েন। গত বছর ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে আসে, ঢাকায় প্রতি লাখ মানুষের জন্য বাস রয়েছে মাত্র ৩০টি। ফলে শহরজুড়ে গণপরিবহনের ঘাটতি যানজটকে আরও তীব্র করছে।

নাফিসা একজন স্কুলছাত্রী, জানাল যে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসা প্রায় অসম্ভব, কারণ অনেক সময় পুরুষরা সেই আসনেই বসে থাকে। গার্মেন্টস কর্মী হাবিবুর রহমান বলেন, সকাল ও বিকাল লোকাল বাসে প্রচণ্ড ভিড় হয়। দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। বাসগুলো সব সময় বিভিন্ন জায়গায় থামে এমনকি যেখানে থামানো নিষিদ্ধ, সেখানেও থামে। ভিড় থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা জোর করে বাসে ঢুকে পড়ে। কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আশিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এত ভিড়ের কারণে বাসে ওঠা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তিনি অপেক্ষা করছেন, ফাঁকা আসন পেলে তবেই উঠবেন।

আইন অনুযায়ী মাসিক বেতনে পরিবহন চালক ও শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে ঢাকার বাস দুটি অনিয়মিত পদ্ধতিতে চলে। প্রথমত. মালিক প্রতিদিন বাসের যাতায়াত ও আয়ের লক্ষ্য ঠিক করে দেন। দিন শেষে সেই আয়ের নির্দিষ্ট অংশ চালক-শ্রমিককে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত. মালিক নির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিময়ে বাসটি চালক-শ্রমিকের কাছে দৈনিক ভাড়ায় দেন। এক্ষেত্রে মালিককে নির্ধারিত টাকা জমা দেওয়ার পর অতিরিক্ত আয়ের পুরোটা চালক-শ্রমিকের হাতে থাকে। এই দুই পদ্ধতিই শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা বাড়ায়।

গণপরিবহন চলাচলের অনুমতিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছেÑ কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া কোনো বাস বা মিনিবাস নির্ধারিত আসনের বেশি যাত্রী নিতে পারবে না। নিবন্ধনের আরেক শর্তে উল্লেখ রয়েছে, কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে সর্বোচ্চ ১০ জন যাত্রী দাঁড় করানো যাবে, তবে সেক্ষেত্রে বাসের ছাদের উচ্চতা কমপক্ষে ছয় ফুট এবং মাঝের পথ ১৮ ইঞ্চি চওড়া হতে হবে। বাস্তবে ঢাকার কোনো বাসই এসব শর্ত মানে না। ‘সিটিং’ সেবার নামে নেওয়া হয় দ্বিগুণ ভাড়া, আর ‘লোকাল’ বাসগুলোতে পা ফেলারও জায়গা থাকে না। যাত্রী দুর্ভোগ তাই প্রতিদিনই বাড়ছে।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) শেষ হওয়া বাসগুলো ডাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে মালিকদের ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে বাড়তি বাসভাড়া আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে এখনও কোনো তথ্য আসেনি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা