রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
পুরান ঢাকার চকবাজারে শতবর্ষী ভাওয়াল রাজকুঠির বর্তমান বেহাল চিত্র। প্রবা ফটো
রাজা নেই, রাজ্যও নেই। নেই তাদের উত্তরসূরিও। তবু রাজকীয় সম্পত্তি নিয়ে চলছে টানাটানি। পুরান ঢাকার নলগোলায় ভাওয়াল রাজ এস্টেটের ১.৮ একর জমি ঘিরে এখন রীতিমতো দখলযুদ্ধ চলছে। একদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, অন্যদিকে লিজের ফাঁদে ফেলা প্রভাবশালী গোষ্ঠী। দীর্ঘদিনের এই দ্বন্দ্বে শতবর্ষী ভাওয়াল রাজকুঠি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। চুপিসারে গিলে ফেলা হচ্ছে ইতিহাস, অথচ তা রক্ষায় নেই কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষা ভাওয়াল রাজকুঠির তিন দিক প্রায় দখল হয়ে গেছে। চকবাজার থানাধীন ৪৭নং রায় ঈশ্বর চন্দ্র শীল বাহাদুর স্ট্রিটে অবস্থিত বাড়িটি এখন প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে। নানা অবকাঠামো গড়ে তোলায় দূর থেকে বোঝাই যায় না এখানে একসময় ছিল রাজকুঠি। এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকারও বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজকুঠির জমি করায়ত্ত করতে একাধিক চক্র ওঁৎ পেতে আছে। লিজের আড়ালে চলছে জমিবাণিজ্য। রাজকীয় জমি ঘিরে এখন দেখা দিয়েছে ত্রিমুখী স্বার্থসংঘাত। সিটি করপোরেশনের বাইরেও ব্যক্তি পর্যায়ে এ সম্পত্তি নিয়ে চলছে দ্বিমুখী জটিলতা। দখল-লিজের জটিল খেলায় এক ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছেন। এরই মধ্যে লিজ সূত্র ধরে আদালতের রায়ে ২০ শতাংশ জমির মালিকানা পেয়ে গেছেন তিনি। তার নাম আলাউদ্দিন সরকার। এখানেই শেষ নয়, তিনি পুরো ১.৮ একর সম্পত্তি কিনতে চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আলাউদ্দিন সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তার বাবা কুদ্দুস সরকার ১৯৭৬ সালে ভাওয়াল রাজ এস্টেট থেকে এ সম্পত্তি লিজ নিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালেও বিক্রির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১১ সালে তাকে ২০ শতাংশ লিজ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে তিনি নলগোলায় অবস্থিত ভাওয়াল রাজার ১.৮ একর সম্পত্তি কিনতে চান। ২০১৪ সালে আদালত উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে তার কাছে ২০ শতাংশ বিক্রির রায় দেন। এরপরও তিনি পুরো সম্পত্তি কিনতে আপিল করেন।
এদিকে ৬৪ জনের আরেকটি পক্ষ রাজকীয় সম্পত্তির ৮০.০৮ শতাংশ জমি লিজ সূত্রে মালিকানা দাবি করছে। তারা একসনা লিজি। এই চক্র ২০১১ সালে একসনা লিজ নিয়ে সেখানে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া তুলত। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের অভিযানে ওইসব দোকান ভেঙে ফেলা হয়। এতে রাজবাড়ির পুরনো কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর সেখানে খুঁটি গেড়ে বায়না সূত্রে মালিক দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেই সাইনবোর্ড হাওয়া হয়ে যায়।
উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেন লিজিরা। রিটকারীদের প্রতিনিধি মো. আকরাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তৎকালীন মেয়র তাপস আমাদের অবৈধভাবে উচ্ছেদ করেছেন। আমরা লিজ সূত্রে মালিক। বেআইনিভাবে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমরা আদালতে রিট করেছি, আমাদের পক্ষে থানায় জিডি করেছেন ভাওয়াল এস্টেটের ম্যানেজার।’
সরকারি নথিতে দেখা যায়, ১৯৮০ সালে ভাওয়াল রাজ এস্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার নলগোলার রাজকুঠির ১.৮ একর জমি ও ভবন তৎকালীন ঢাকা পৌর করপোরেশনের সঙ্গে বিক্রয় চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু গেইন ট্যাক্স সংক্রান্ত বিরোধ, লিজিদের মামলা ও আদালতের স্থিতাবস্থার কারণে বিক্রয় দলিল কার্যকর হয়নি। ফলে আজও সিটি করপোরেশন জমির মালিকানা পেতে রেজিস্ট্রি করতে পারেনি। এরও আগে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্বাহী আদেশে ভাওয়াল রাজ এস্টেটের জমি ঢাকা পৌর করপোরেশনের অধীনে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশও বাস্তবায়িত হয়নি।
ভাওয়াল রাজার সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভাওয়াল রাজ এস্টেট কোর্ট অব ওয়ার্ডস। সংস্থাটির বর্তমান ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি কখনও নলগোলায় অবস্থিত ভাওয়াল রাজকুঠি পরিদর্শন করিনি। সেখানে সংরক্ষণযোগ্য কোনো স্থাপনা আছে বলে জানতাম না। এমন কোনো স্থাপনা থাকলে তা অবশ্যই আমার নলেজে থাকত। ভাওয়াল রাজ এস্টেটের সম্পত্তি নিয়ে যা কিছু হবে, তা বিধিসম্মতভাবে হবে। সিটি করপোরেশন ও ভাওয়াল এস্টেটের বিরোধ স্থানীয় সরকার ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের যৌথভাবে সমাধান করতে হবে। মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ সম্পত্তি ছাড়তে পারি না।’
২০২৩ সালে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অভিযানে লিজিদের উচ্ছেদকে ‘অন্যায়’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমাকে লিজিদের স্বার্থই দেখতে হবে, কারণ তারাই সম্পত্তি রক্ষা করছে এবং নিয়মিত লিজমানি দেয়। তবে লিজ দেওয়ার শর্তগুলো তিনি বলতে পারেননি।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ভাওয়াল রাজকুঠি একসময় হেরিটেজ লিস্টে ছিল। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা নষ্ট করা হয়েছে। একসময় স্থানীয় এমপি হাজী সেলিমের লোকজন রাজকুঠির একটা অংশ ভেঙে ফেলেছিল। থানায় জিডি করে ভাঙা বন্ধ করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকেও তখন জানানো হয়েছিল।
ভাওয়াল রাজার সম্পত্তি রক্ষায় গত ২০ অক্টোবর স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ ‘জনস্বার্থ কমিটি’ ব্যানারে বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরে চিঠি দিয়েছে। জনস্বার্থ কমিটির সভাপতি ও বিএনপির নেতা এইচএম দিপু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভাওয়াল রাজার বাড়ি পূর্বের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট জায়গায় স্থানীয় শিশুদের জন্য খেলার মাঠ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নির্বাহী আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এরইমধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় হেরিটেজ ভবনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে নিদের্শ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ লক্ষে গত ২৪ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মাহবুবা আইরিন সই করা অফিস আদেশে এ নিদের্শনা দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শত বছরের পুরনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনও টিকে আছে। দখলদাররা বারবার রাজকুঠিতে আঘাত করে নকশা বদল করেছে। ভাঙা দেয়াল ও পুরনো অবকাঠামো এখনও বহন করছে ক্ষয়ের চিহ্ন। কোথাও মেঝে পাকা, কোথাও জংলা। বাঁশখুঁটি দিয়ে দখল টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কিছু দেয়ালের গায়ে জলসা ঘরের পুরনো কারুকাজ আজও দৃশ্যমান। জমির কিছু অংশে আন্ডারপ্রিভিলেজড চিলড্রেন’স এডুকেশনাল প্রোগ্রামসের (ইউসেপ) টেকনিক্যাল স্কুল, ঢাকা ওয়াসার পাম্প ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নিশান’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল পুরান ঢাকার এই ভাওয়াল রাজকুঠিতে।
ইতিহাস বলছে, রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী অবসর সময় কাটাতে আসতেন বুড়িগঙ্গার তীরে এই রাজবাড়িতে। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে জয়দেবপুর রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরলে সংস্কারের সময় রাজা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে নলগোলার এই রাজবাড়িতে আনা হয়। ১৯০১ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেই ঘটনার সাক্ষী এই রাজকুঠি আজ পরিণত হয়েছে ইতিহাসের নিঃশব্দ ধ্বংসস্মৃতিতে। প্রশাসনিক জটিলতা আর স্বার্থের সংঘাতে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সময়ের ইতিহাস, যা হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।