× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজধানী

শব্দদূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন, নীরবতা যেন বিলাসিতা

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৭ এএম

শব্দদূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন, নীরবতা যেন বিলাসিতা

ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর রাস্তাঘাটে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি কানে আসে, সেটি হলো যানবাহনের অবিরাম হর্ন। যেন অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছেÑ কে কত জোরে এবং কতবার হর্ন বাজাতে পারে। বাস-ট্রাক, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ভ্যান-রিকশাÑ উচ্চস্বরে হর্ন বাজানো এসব যানবাহনের চালকের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণকাজ, লাউডস্পিকার, বাজার ও ব্যস্ত মোড়ের বিভিন্ন উৎসের শব্দ। ফলে রাজধানীর বাতাস যেন ভয়াবহ শব্দদূষণে ভরে থাকে, যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত শব্দদূষণ সব বয়সের মানুষের জন্য সমান ক্ষতিকর। এর ফলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি, মস্তিষ্কে চাপ, রাগ-উত্তেজনা, মনোযোগ ভেঙে যাওয়া, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের তথ্য বলছে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে আলসার, মাথাব্যথা, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক অস্থিরতা ও স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিও বাড়ায়। এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর ওপরও শব্দদূষণের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের গ্রহণযোগ্য সীমা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা এ মানদণ্ড থেকে বহু দূরে। ব্যস্ত সড়কে সারাদিন শব্দের মাত্রা ৮০-১০০ ডেসিবেল পর্যন্ত থাকে এবং কিছু মোড়ে তা ১১০ ডেসিবেলেও পৌঁছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য ক্ষতিকর। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ মাত্রা প্রতিনিয়তই বহুগুণ বেশি থাকে। ফলে শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ, ক্লান্তি ও মানসিক বিপর্যয় বাড়ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু অভিজ্ঞতা নয়, সাম্প্রতিক বহু গবেষণাতেও উঠে এসেছে।

চলতি বছর প্রকাশিত ‘স্পেশিও-টেম্পোরাল প্যাটার্নস ইন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড সাউন্ড ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার ৭০টি স্থানে শব্দমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, শহরের অধিকাংশ স্থানে শব্দের মাত্রা দিন-রাতের অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করে। পরিবহন করিডোর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং মিশ্র ব্যবহারের এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। মৌসুমি পরিবর্তনেও শব্দদূষণের তীব্রতা কমেনি। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত অপর একটি গবেষণায় দেখা যায়, জরিপকৃত প্রতিটি এলাকাতেই শব্দের গড় মাত্রা আইনসংগত সীমার ওপরে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন অফিস শেষে যানবাহনের চাপ বাড়ার ফলে শব্দমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। গবেষকরা উল্লেখ করেন, শব্দদূষণের ফলে মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা, মনোযোগহীনতা ও শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশে ২০০৬ সালে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, যাতে পাঁচটি জোন অনুযায়ী শব্দের অনুমোদিত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছেÑ নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক এবং শিল্প এলাকা। নীরব এলাকায় (স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের ১০০ মিটার এলাকাজুড়ে) দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এসব স্থানের আশপাশেও হর্ন বাজানো বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন লাখো মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন এবং তাদের বেশিরভাগই অযথা শব্দ আর হর্নের কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। এক মোটরবাইক চালক জানান, ধীরে চলার পরেও মানুষ আমাকে হর্ন না দেওয়ার জন্যই দোষারোপ করে। যেন হর্ন না বাজানোই অপরাধ। কুড়িল এলাকায় বসবাসকারী রাশেদুল রহমান বলেন, বিমান ওঠানামার শব্দে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। কখনও মনে হয় বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। নীরবতা এখানে যেন বিলাসিতা।

প্রতিদিন হেঁটে কর্মস্থলে যাওয়া শাহরিয়ার কবির বলেন, রাস্তা দিয়ে ১৫ মিনিট হাঁটলেও মাথাব্যথা শুরু হয়। গাড়িগুলো যেন হর্নের প্রতিযোগিতা করছে। এতে পথচারীদের জীবনক্রম ভীষণ কষ্টকর হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে শব্দদূষণ ঢাকার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষক ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদের মতে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা, লাউডস্পিকারসহ উচ্চমাত্রার শব্দের উৎসগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন করতে পারলে শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, হর্নের অতিরিক্ত শব্দ মনোযোগ নষ্ট করে, বিরক্তি বাড়ায় এবং কাজ করার মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সামনে হর্ন বাজালে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও রোগীদের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি আরও বলেন, শব্দদূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। তাই অযথা হর্ন বাজানো বন্ধ করা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। বর্তমান প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য একটি শান্ত, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে এখনই সম্মিলিতভাবে সবার এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা