× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পূর্ব জুরাইন ও মুরাদপুর

উঁচু রাস্তায় নিচু বাসা, নিত্যসঙ্গী জলাবদ্ধতা

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:২৭ পিএম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৫০ এএম

উঁচু রাস্তায় নিচু বাসা, নিত্যসঙ্গী জলাবদ্ধতা

চারতলা বাড়ির নিচতলা ডুবে আছে পানিতে। ডুবে গেছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। পানি না মাড়িয়ে ওপরে ওঠার জন্য একসময় ইটের খোয়া ভর্তি বস্তা ফেলা হয়েছিল এই সিঁড়ির গোড়ায়। কিন্তু কাজ হয়নি। শেষমেশ এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দূর করতে কেনা হয়েছে মোটর। যাতে পানি সেচে বের করে দেওয়া যায় নিচতলা থেকে।

এই দৃশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব জুরাইনের ৭৯০ নম্বর বাসার। বৃষ্টি হলেই এ বাসার নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়। ভবনের দুপাশে ড্রেন থাকলেও তা কোনো কাজে আসে না। কারণ, সড়কের চেয়ে প্রায় চার ফুট নিচু এই বাসা। সেচ দিয়ে বাসার নিচতলায় জমে ওঠা পানি বের করে না দিলে কেউই পারেন না এ বাসায় যাতায়াত করতে। শুধু এই বাড়ি নয়, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের অনেক বাড়িঘরই সড়ক থেকে নিচু। বৃষ্টি হলেই সেগুলোতে পানি জমে যায়।

বারবার রাস্তা শুধু উঁচুই করা হয়

পূর্ব জুরাইন ও মুরাদপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড। ওয়ার্ডটি ডিএনডি বাঁধের ভেতরে। পূর্ব জুরাইনের নবীনবাগ, ব্যাংক কলোনি, হাজী কে আলী সরদার রোড (মিষ্টির দোকান এলাকা), ঋষিপাড়া, কমিশনার রোড ও দারগাবাড়ি রোড এই ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন। প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখানে বাস করেন। কিন্তু নাগরিক সুবিধার চিত্র অত্যন্ত করুণ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না করে বারবার শুধু রাস্তা উঁচু করায় পুরনো বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। ফলে পুরনো অনেক বাড়িই একতলা, দেড়তলা বা আধাতলা নিচে নেমে গেছে। বৃষ্টি হলে এসব বাড়ির নিচতলা ডুবে যায়। তখন পানি সেচে বের করে দিতে হয়। 

পূর্ব জুরাইন হাই স্কুল রোডের বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে কোনো পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য করপোরেশন বারবার রাস্তা উঁচু করে। এতে সাময়িক সুবিধা হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার পানি জমে। আসলে রাস্তা উঁচু করার নামে শুধু পকেট ভারী করা হয়।’ পূর্ব জুরাইনের কমিশনার রোডেও রাস্তা উঁচু হওয়ায় অনেক বাড়িঘর নিচু হয়ে গেছে।

বৃষ্টি না হলেও জমে নোংরা পানি

সরেজমিন দেখা গেছে, বৃষ্টি ছাড়াই আশ্রাফ মাস্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ভবনের সামনের সড়কে ড্রেন ও কলকারখানার নোংরা পানি জমে আছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রবেশের রাস্তা যেন কাদাজল ও ময়লার ভাগাড়। এক বাড়ির মালিক নিজ উদ্যোগে সড়ক থেকে ময়লা পরিষ্কার করছিলেন। তার নাম রাশিদা বেগম, তিনি ১৮৪২ নম্বর বাড়ির মালিক। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। কাদাজল আমাদের নিত্যসঙ্গী। রাস্তায় পা দেওয়া যায় না। তাই নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করাচ্ছি। আমাদের কষ্ট নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।’

একই সমস্যা পূর্ব জুরাইনের ঋষিপাড়ায়। সেখানেও বৃষ্টি ছাড়াই রোজ দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পানি জমে। প্রায় ৬০ বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করছেন ইওর চয়েস টেইলার্সের মালিক আব্দুল গনি। তিনি বললেন, ‘বৃষ্টি এলে তো কথাই নেই, কিন্তু বৃষ্টি না হলেও দুপুর ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সড়কে পানি জমে থাকে। আমাদের ড্রেন ২ ফুটের, রাস্তাটি ১২ ফুটের। যদি ড্রেন ৪ ফুট হতো, তবে পানি জমে থাকত না। দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থার কারণেই এই অবস্থা।’

খানাখন্দে ভরা বিভিন্ন সড়ক

সরেজমিনে এও দেখা গেছে, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক খানাখন্দে ভরা। কোথাও নতুন ঢালা আরসিসি রাস্তা তিন মাস না যেতেই ভেঙে পড়েছে। মেরামতের উদ্যোগ নেই। পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে জমে আছে পানি। ওয়ার্ডের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিতাস খালে ফেলে রাখা হয়েছে আবর্জনা। বিভিন্ন জায়গায় নেই সড়কবাতি, কোথাও কোথাও থাকলেও তাতে আলো জ্বলে না মাসের পর মাস। অন্ধকারে খোলা ড্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ওয়াসা মোড়ে উন্মুক্ত জায়গায় নিয়মিত ফেলা হচ্ছে বাসাবাড়ির বর্জ্য। দারগাবাড়ি রোডের মুখে দারুসসালাম জামে মসজিদের একাংশের রাস্তা দুই ফুট উঁচু, আরেকাংশ নিচু। নিচু অংশে ড্রেনের পচা পানি জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। 

সামাজিক উদ্যোগে রাস্তা সংস্কার 

বেহাল রাস্তার কারণে সামাজিক উদ্যোগে রাস্তা মেরামত করছেন নবীনবাগ ও ব্যাংক কলোনির বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক কলোনির রাস্তায় পানি ও ময়লা জমে থাকত; হাঁটাও যেত না। সিটি করপোরেশনে অভিযোগ করেও প্রতিকার পায়নি স্থানীয় বাসিন্দারা। অনন্যোপায় হয়ে তারা নিজেদের উদ্যোগেই বালি ও রাবিশ ফেলে রাস্তা ব্যবহারযোগ্য করেছেন। ব্যাংক কলোনির স্থায়ী বাসিন্দা মো. আবুল হোসেন সরকার (হোল্ডিং নম্বর ১১৬৫) বলেন, ‘আমরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিই। তবুও সিটি করপোরেশন থেকে কোনো সেবা পাই না। রাতে এলাকায় একটাও বাতি জ্বলে না। করপোরেশনে গেলে বলে এখন কিছু করার নেই, নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়েই নিজেদের টাকায় আমরা রাস্তায় বালু ফেলেছি।’

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু আসলাম বলেন, ‘জুরাইনের জলাবদ্ধতা সমস্যা দীর্ঘদিনের। এটা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে সমাধান করতে হবে। আমাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারও নির্দেশ দিয়েছেনÑ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করে আর রাস্তা করা যাবে না। এখন ড্রেনেজকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের বলেন, ‘জুরাইন নিচু এলাকা। এটা ডিএনডি বাঁধের মধ্যে পড়েছে। এই এলাকায় তিতাস, শ্যামপুর ও জিয়া সরণি খাল রয়েছে। সহসা এই এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা দূর করা যাবে। এজন্য খালের পানি নদী পর্যন্ত যাতে বিনা বাধায় পৌঁছতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

নাগরিক সুবিধা ও সেবা না পাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ

পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর সমন্বয়হীনতার কারণে আমরা প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা পাই না। অথচ ট্যাক্স-ভ্যাট ঠিকই দিচ্ছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নিয়মিত নাগরিক সেবাও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে কাউন্সিলররা অন্তত চক্ষুলজ্জায় কিছু কাজ করত, এখন তাও নেই।’ শুধু মিজানুর রহমান নন, নগর অব্যবস্থাপনার ভুক্তভোগী জুরাইনের সব অধিবাসীর মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ রয়েছে সেখানকার জলাবদ্ধতা ও খানাখন্দে ভরা সড়ক নিয়ে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা