সেমিনারে তথ্য
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১৮:০৫ পিএম
দেশে প্রতিদিন ১৫ লাখ মানুষ পোল্ট্রি খামাারের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে থাকেন। এটি মোট খামারির ৬৮ শতাংশ। দেশের চার বিভাগের সাতটি জেলার ১০০ ফার্ম নিয়ে গবেষণা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্রয়লার, সোনালি ও লেয়ার মুরগির খাদ্য, পানি, ডিম ও মাংস নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। অপরদিকে আম, কলা, পেঁপে ও টমেটোসহ বিভিন্ন ফল ইথিলিন দিয়ে পাকানোর বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। তাতে বলা হয়, স্প্রে করে ফল পাকানো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। অথচ আমাদের দেশে এটাই করা হয়ে থাকে।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শাহবাগে নিজস্ব কার্যালয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) আয়োজিত গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বিএফএসএ’র চেয়ারম্যান জাকারিয়ার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসিন, আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গুলজারুল আজীজ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পিএসও ড. তাসরিন রাবিয়া চৌধুরী।
মো. ইয়াসিন বলেন, খাদ্যের বড় একটি ইকোসিস্টেম আছে। খাদ্যপ্রস্তুত বিষয়টি উৎপাদন থেকে বাজার, সেখান থেকে ফ্যাক্টরি এবং তা হয়ে আমাদের রান্নাঘর। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর কাজ এর মধ্যেই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, খামারিতে অনেক সময় নিজের প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের নিরাপদ অবস্থান থেকে জবাব দেন। তিনি বলেন, আমরা অনেক সময়ে দীর্ঘদিন ঘরে ফল রেখে দিলে পাকে না। আমরা পোল্ট্রি খাব না বলে সোনালীর দিকে ঝুঁকছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সোনালিতে অ্যান্টিবায়োটিক বেশি, তবে মাত্রা সহনীয় মাত্রায় রয়েছে।
‘রুট কস অ্যানালাইসিস অব হেভি মেটাল অ্যান্ড অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ ইন পোল্ট্রি ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ এ সামাদ। তিনি বলেন, গত ১০০ বছরে মানুষ বেড়েছে চার গুণ। গত ৫০ বছরে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়েছে ৬০ শতাংশ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদন বেড়েছেই চলেছে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রোটিন উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। আমাদের এসব অঞ্চলে মানুষের সঙ্গে প্রাণির সংখ্যার ঘনত্বও বেশি। তাতে রোগবালাইও প্রচুর হয়। তাই এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও অধিক।
মোহাম্মদ এ সামাদ জানান, ৮৪ শতাংশ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে জানেন। তবে ৮০ শতাংশ মানুষ পশু ও পাখির খাদ্যে এটির ব্যবহারের আইন সম্পর্কে জানেন না। ৬৫ শতাংশ খামারি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন সম্পর্কে আগ্রহী নন। ডিম ও মাংসে ব্রয়লারে সিপ্রোপক্সাসিন বেশি ব্যবহার করা হয়। মধ্য ও ছোট খামারে বেশি পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। বগুড়া ও জয়পুরহাটে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি। সোনালি মুরগি ৯০ দিন সময় লাগে, তাই সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি। কোনো খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল না, অর্থাৎ খামারি পরে নিজ থেকে ব্যবহার করেছেন।
হেভি মেটাল সম্পর্কে তিনি বলেন, হেভি মেটাল বাতাস, খাদ্য, পানি থেকে মুরগিতে ঢুকছে। ৫০ শতাংশ খামারি মোটাতাজা করতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করেন। তারা বিক্রির সময়সীমা চিন্তা করে এটি ব্যবহার করেন না।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গুলজারুল আজীজ বলেন, আমাদের দেশে দ্রুত সময়ে পোল্ট্রি মুরগিগুলোকে বড় করতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে।
ড. তাসরিন রাবিয়া চৌধুরী বলেন, শিশুদের রক্তে সিসা পাওয়া যাচ্ছে। মাছেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। শিশুরা চিকেন ফ্রাই বেশি খায়। এখানে পরিবারের তেমন কিছু করার থাকে না। পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যে বেশি সিসা পাওয়া যায়। সরকারিভাবে এটি মনিটরিং করা দরকার। ফল পাকানোতে ইথিলিন ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি আমদানি না করে বরং আমরা নিজেরা উৎপাদন করতে পারি।
জাকারিয়া বলেন, আগে স্বাভাবিক পর্যায়ে কৃষক ফল পাকাতেন। কিন্তু বর্তমানে ফলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অবৈধ উপায়ে ফল পাকানো শুরু হয়েছে। এটি কীভাবে বৈধভাবে করা যায়, সে সম্পর্কে গবেষণা করা হয়।
তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক যে লেভেলে আছে তা সর্বনিম্ন মাত্রার কাছাকাছি। তবে হেভি মেটাল বেশি আছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণা উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশে সাড়ে তিন কোটি শিশু সিসায় আক্রান্ত। এটি আমাদের জন্য সর্তক সংকেত। আর এটি প্রতিহত করতে ১০ বছরের অ্যাকশন প্ল্যান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা গবেষকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে উৎসাহ দেই। কোনো হস্তক্ষেপ নেই। দশ বছরে ১৬টি আইন করা হয়েছে। কেননা আইন করলে জবাবদিহি করা যায়।
‘স্যান্ডারডাইজেশন অব ইথিলিন গ্যাস ফর ইউনিফর্ম ফ্রুট রিপেনিং ইন লো-কস্ট রিপেনিং চেম্বার’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন বারির বিজ্ঞানী ড. এম জি ফেরদৌস চৌধুরী।
তিনি বলেন, আম, কলা, পেঁপে ও টমেটোÑ এ চারটি ফল কীভাবে পাকানো হয় তা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এটি ইথিলিন দিয়ে পাকানো দরকার। এটি আন্তর্জাতিক নিয়ম। ইথিলিন পরিপুষ্ট ফলকে পাকাতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে ইথিলিন গ্যাস দিয়ে পাকালে ৫০-১০০ পিপিএম দিয়ে চেম্বারে ১২ ঘণ্টা সময় ধরে রাখতে হবে। এটি তিনদিনের মধ্যে পাকবে। তাহলে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আমাদের দেশে স্প্রে করে ফল পাকানো হয়। এটি নিয়ম নেই।
খরচ সম্পর্কে তিনি বলেন, দেড় থেকে দুই টনের চেম্বার তৈরিতে তিন লাখ টাকা এবং অপারেশন ব্যয় ১৭ হাজার ৪০০ টাকা। তাতে প্রতি কেজিতে দুই টাকা। মাসে ৩৬ হাজার টাকা লাভ হবে এবং নিট লাভ হবে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা। তাতে ১৪ মাসে পুরো টাকা চলে আসবে। তবে অপরিপক্ব বা অপরিপুষ্ট ফল পাকানো যাবে না। নরসিংদীর মনোহরদী ও রাজশাহীর গোদাগারীতে দুটি চেম্বার স্থাপন করা হয়েছে।
ইথিলিন পাওয়ার ব্যাপারে বারির বিজ্ঞানী হাফিজুল হক বলেন, আমদানি করা যায়। এ গ্যাসের চাহিদা তৈরি হলে কাঁচামাল হিসেবে আমদানি হতে পারে। বর্তমানে এটি আমদানির তালিকায় নেই।