জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান
শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ০০:৫৮ এএম
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ০১:০৫ এএম
১৭ একর আয়তনের ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। ১৫ হাজার ঘরে বসবাস ৫০ হাজার মানুষের। সব ধরনের মাদকের পসরা বসে এখানে। সরকার আসে, সরকার যায়; শুধু জেনেভা ক্যাম্প থেকে যায় স্বমহিমায়। দেশের সব স্থান থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হলেও ক্যাম্পটি থেকে যায় মাদক কারবারিদের দখলে। চলে আধিপত্যের লড়াই। বছরে অন্তত ১৫০ কোটি টাকার মাদক বিক্রি হয় এখানে। আগে এ ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করত নাদিম ওরফে পঁচিশ ও ইশতিয়াক। ২০১৮ সালে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নাদিম নিহত হয়। এর দুই বছর পর ভারতে পলাতক অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ইশতিয়াক। বর্তমানে জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল।
এই নামটি গোটা ক্যাম্পে অস্থিরতার প্রতীক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৮৩ শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায় নাম রয়েছে সোহেলের। গত এক বছরে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় যত হত্যা হয়েছে, সেগুলোতে রয়েছে এই বুনিয়া সোহেলের হাত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক ও মাদকসহ মোট ৩৮টি মামলা রয়েছে। এ বছরের শুরুতে গ্রেপ্তার হলেও ছয় মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পায় সে। মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধমূলক কার্যক্রম শুরু করে। বুনিয়া সোহেলের গ্রুপে টুনটুন, রানা, রাজন ওরফে কালু, কলিম জাম্বু, মোহাম্মদ আলী, বানর আরিফসহ ৫০ জন সদস্য রয়েছে। যারা মাদক, চুরি, ছিনতাই, হত্যা সব কাজেই পারদর্শী। রয়েছে আলাদা কিশোর গ্যাং গ্রুপ। সোহেল ও তার লোকজনের বেশিরভাগই থাকেন ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে। আল ফালাহ মেডিকেল সংলগ্ন জি ব্লকে সোহেলের মাদকের স্পট। ছোট ছোট ঘর এবং পান-সিগারেট-চায়ের দোকানগুলো তারা মাদকের স্পট হিসেবে ব্যবহার করে।
স্থানীয়রা জানান, সোহেলের ছোট থেকে বড় হওয়া জেনেভা ক্যাম্প এলাকায়। তার মূল নাম ভূঁইয়া সোহেল হলেও মাদক ব্যবসায় জড়ানোর পর নাম হয় বুনিয়া সোহেল। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে ইয়াবা এবং হেরোইনের কারবারে জড়িত সে। তার ছোট ভাই টুনটুন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যও সোহেলকে সহায়তা করে মাদক ব্যবসায়। গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকার পরও থেমে ছিল না সোহেলের মাদক ব্যবসা। পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করেছে তার ছোট ভাই টুনটুন। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে পুরো পরিবার হয়েছে কয়েক কোটি টাকার মালিক। টাকা দিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রশাসনকে। এজন্য বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হলেও গ্রেপ্তার করা যায়নি বুনিয়া সোহেলকে। ভয়ে এলাকায় কেউ তাদের সম্পর্কে কথাও বলতে চায় না।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেলের আস্তানায় অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। অভিযানের খবর আগেই পৌঁছে যায় সোহেল কাছে। বাহিনী পৌঁছানো মাত্রই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পালিয়ে যায় সোহেল। তার ডেরা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩টি তাজা ককটেল বোমা, ২৫টি আধা প্রস্তুত ককটেল, ৪০০ গ্রাম গানপাউডার, ২টি সামুরাই তলোয়ার, ১২টি হকিস্টিক, ২৯টি হেলমেট, ২টি ড্রাগন লাইট, ১১ কেজি গাঁজা, ১২ প্যাকেট হেরোইন, নগদ ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং একটি টাকা গণনার মেশিন।
অভিযানের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, জেনেভা ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হলেও সোহেল পালিয়ে যায়। সংকীর্ণ গলি ও লাগোয়া ভবনের কারণে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত ৪ জুন জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেলের মাদকের ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য ও অস্ত্রসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ক্যাম্পের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়তই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
এসপিজিআরসি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা চলছে। এখানে বসবাসকারীরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়েছে। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ক্যাম্পের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা মাদক ব্যবসায় জড়িত। জামিনে থাকা ১১ জনের পাশাপাশি অন্তত ২০ জন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছে ক্যাম্পের মাদক ব্যাবসা। তারা ক্যাম্পে থাকে না। শিশু ও কিশোরদের পাশাপাশি নারীদেরও ব্যবহার করে তারা ক্যাম্পে মাদক কারবার করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইসহাক ইলাহী চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চলছে। এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিতে হবে। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তারের পর যাতে সহজে বের হতে না পারে, সে বিষয়টিও লক্ষ রাখতে হবে।